স্ফিংস দেখার বিস্ময় লেখককে বাধ্য করেছে এই মোনোলিথের সম্পর্কে আরও জানার, আরও জানানোর। সেই তথ্য সঞ্চয়ন করতে গিয়ে তিনি সন্ধান পেয়েছেন মিশর ও গ্রিক মাইথোলজির রাক্ষস, দানবীদের কথাও।

স্ফিংস

কর্মসূত্রে মিশর যেতে হবে শুনে সব থেকে আনন্দ হয়েছিল পিরামিড দেখতে পাব বলে। চাক্ষুস সেই ইতিহাস দেখার পর অবশ্য বিস্ময় ছাপিয়ে গিয়েছিল আনন্দকে। তবে বেশি অবাক হয়েছিলাম স্ফিংস দেখে।

বিশ্ববিখ্যাত এই মূর্তিকে মানুষ চেনে, ‘দ্য গ্রেট স্ফিংস অফ গিজা’ নামে। আরবি লেব্জ এর নাম , ‘বিভীষিকার জনক’। এই প্রাচীন স্থাপত্যটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ‘মনোলিথ’ মূর্তি যার দৈর্ঘ্য ৭৩.৫ মিটার ও প্রস্থ ৬ মিটার। মূর্তিটি ২০ মিটার উচু। ঐতিহাসিক মতে, ৩০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে এই স্থাপত্যটি তৈরি করা হয়।

প্রাচীন মিশরের পিরামিড ও মমির পাশাপাশি স্ফিংসকে ঘিরেও যুগে যুগে মানুষের অসীম কৌতূহল। সিংহ আর মানুষের আকৃতির মিশ্রণ তার চেহারায় এক রহস্যময় রূপ ফুটিয়ে তোলে। স্ফিংস শব্দটি মূলত গ্রিক ক্রিয়াপদ ‘স্ফিংগো’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ শ্বাসরোধ করে হত্যা করা। লক্ষ্যণীয় এই যে স্বয়ং পশুরাজদের শিকার ধরার প্রক্রিয়াও ঠিক এমনই। সিংহ শৌর্যের প্রতীক। তাই মানবদেহের সঙ্গে তার গঠনের মিশেল ঘটিয়ে প্রাচীন কথক-স্থপতিরা হয়তো মানুষের বুদ্ধি ও সিংহের বিক্রমের মিশ্রণ তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

মিশরীয় প্রাচীন ইতিহাসে একাধিক স্ফিংসের উল্লেখ পাওয়া যায়। এরা প্রধানত মিন্দর রক্ষক ছিলেন। তবে শুধু মিন্দরই নয়, পিরামিড, অর্থাৎ রাজকীয় সমাধির দ্বার-প্রান্তেও স্ফিংসের উপিস্থতি ছিল। ঐতিহাসিক মিশরীয় চিওস্‌ নগরের প্রতীক ছিলেন স্ফিংস। সে যুগের বহু সিলমোহর ও মুদ্রার পিঠেও খোদাই করা থাকত স্ফিংসের অবয়ব।

অমার দেখা রাতের স্ফিংস

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে প্রচলিত গল্প জানতে চেয়েছিলাম। সে ভাবে কোনও তথ্য তাঁরা দিতে পারেননি। তাই ঠিক করে ফেলেছিলাম, এই মনুষ্যমুখী সিংহ প্রহরীর সম্বেন্ধ একটু পড়াশোনা করা উচিৎ। দেশে ফিরেই লেগে পড়লাম। আর যা জানলাম তা কতকটা এমন:

স্ফিংসের উল্লেখ পাওয়া যায় গ্রিক পুরাণে। গ্রিকরা অবশ্য স্ফিংসের দেহে নারীর সৌষ্ঠব প্রয়োগ করেছিলেন। গ্রিসে স্ফিংসের পরিচয় ধ্বংস ও দুর্ভাগ্যের বাহক এক দানবী হিসেবে।

গ্রিক পুরাণ মতে, স্ফিংস ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের থিব্‌স নগরীর রক্ষক। নগরীতে প্রবেশকারী আগন্তুককে ধাঁধার জটিল জালে বন্দি করার কৌশল ছিল স্ফিংসের একচেটিয়া রণনীতি। সেইসব কূট প্রশ্নের উত্তর জানা ছিল না কোনও মানুষের। ধাঁধার সমাধান না করতে পারলে থিব্‌স-এ প্রবেশ করা তো যেতই না, উপরন্তু খোয়া যেত প্রাণটাও। উত্তর দিতে অপারগ সেইসব হতভাগ্য মানুষকে বধ করে উদরপূর্তি হত স্ফিংসের। একমাত্র ব্যতিক্রম ইডিপাস। স্ফিংস এই গ্রিক বীরকে প্রশ্ন করেন: ‘কোন সেই জন্তু যে সকালে চতুষ্পদ, মধ্যাহ্নে দ্বি-পদ আর সন্ধ্যায় তিন পদের সাহায্যে চলে?’
প্রত্যুত্তরে ইডিপাস জানান, তার নাম মানুষ। শৈশবে সে চার হাত-পায়ের সাহায্যে হামাগুড়ি দেয়, যৌবনে দু’পায়ের ওপর ঋজু হয়ে চলে আবার বার্ধ্যক্যে হাতের লাঠির ওপর ভর করে হাটে। কথিত আছে, এই উত্তর শোনার পরই ধ্বংস হয়ে যায় স্ফিংস ও তার সঙ্গের বিভীষিকা। পুরাতাত্ত্বিকরা অবশ্য এই কাহিনিকে রূপক আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, আসলে এর পরই অবসান হয় আদিম উপাসনা রীতির। গ্রিসে সূচনা হয় পরবতর্ী যুগের অলিম্পিয়ান দেবদেবীর পূজার্চনার প্রথা।

কল্পকথা তা হলে মিশর, গ্রিস সবারই আছে! আছে অবিশ্বাস্য সব গল্পও! রাক্ষস, দানবী, সুপারম্যানও আছে। আর লোকে কেবল হিন্দু দেবদেবীদের নিয়েই গল্প ফাঁদেন।

গার্গী গুহঠাকুরতা
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ জুন ২০০৮