কাপ্তাই লেকের বুকে ছোট্ট একটি গিরিশহর রাঙামাটি। পার্বত্য চট্টগ্রামের এ জেলার সর্বত্রই রয়েছে নানান বৈচিত্র্যের ভান্ডার। শীতে এখানে বেড়নোর মজাই আলাদা।

ঢাকা থেকে রাত দশটার বাসে চড়লে খুব ভোরেই পৌঁছানো যায় রাঙ্গমাটি শহরে। শহরে নেমে হোটেলে উঠে একটু বিশ্রাম নিয়ে বেড়িয়ে পড়তে পারেন। প্রথম দিনে শহর ও এর আশ-পাশের দর্শনীয় জায়গাগুলোতে বেড়ানো যেতে পারে। রাঙামাটি শহরের শুরুর দিকটায় রয়েছে উপজাতীয় জাদুঘর। বেবিটেক্সিওয়ালাকে বললেই আপনাকে নিয়ে যাবে জাদুঘরে। এখানে রয়েছে রাঙামাটিসহ পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত নানান আদিবাসিদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সময়ের নানার সরঞ্জামাদি, পোশাক, জীবনাচরণ এবং বিভিন্ন ধরনের তথ্য। ছোট অথচ অত্যন্ত সমৃদ্ধ এ জাদুঘরটি খোলা থাকে সোম থেকে শুক্রবার সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪ টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। শনি, রবি ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনগুলোতে জাদুঘর বন্ধ থাকে। জাদুঘরে প্রবেশে বড়দের জন্য পাঁচ টাকা ও ছোটদের জন্য দুই টাকা লাগে।

উপজাতীয় জাদুঘর দেখে চলে যেতে পারেন পাশ্ববর্তী রাজ বন বিহারে। এ অঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটি তীর্থস্থান এই রাজবন বিহার। এখানে আছে একটি প্রার্থনালয়, একটি প্যাগোডা, বনভান্তের (বৌদ্ধ ভিক্ষু) আবাস স্থল ও বনভান্তের ভোজনালয়। প্রতি শুক্রবার ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে এখানে চলে প্রার্থনা। রাজ বন বিহারে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে পারেন কাপ্তাই লেকের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য।

রাজবনবিহারের পাশেই কাপ্তাই লেকের ছোট্ট একটি দ্বীপ জুড়ে রয়েছে চাকমা রাজার রাজবাড়ি। নৌকায় পার হয়ে খুব সহজেই যাওয়া যায় এই রাজবাড়িতে। আঁকা বাঁকা সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠে গাছের ছায়ায় ইট বাঁধানো পথের মাথায় এ সুন্দর বাড়িটি। এখানে আরো রয়েছে চাকমা সার্কেলের প্রশাসনিক দপ্তর।

এবার লেক পাড় হয়ে বেবিটেক্সি করে চলে আসুন রিজার্ভ বাজারে। ঘুরে ফিরে দেখুন রাঙামাটির ব্যস্ততম এই জায়গাটি। রিজার্ভ বাজার থেকেই রাঙামাটির বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার লঞ্চ ছাড়ে।

রিজার্ভ বাজার থেকে এবার চলুন পর্যটন কমপ্লেক্সে। পুরো রাঙামাটি শহরের সব জায়গাতে লোকাল বেবিটেক্সি চললেও এখানে যেতে হবে কিন্তু রিজার্ভ নিয়ে। ভাড়া ৭০-৮০ টাকা। তবে লোকাল বেবিটেক্সিতে চড়ে তবলছড়ি বাজারে এসে সেখান থেকে পায়ে হেঁটেও পর্যটন কমপ্লেক্সে আসতে পারেন। তবলছড়ি বাজার থেকে এখানকার দূরত্ব দেড় কিলোমিটার। রাস্তা সৌন্দর্য দেখতে দেখতে এই অল্প পথ নিমিষেই ফুরিয়ে যাবে। পর্যটন কমপ্লেক্সের ভেতরেই রয়েছে সবার চেনা সুন্দর ঝুলন্ত সেতুটি। দশ টাকার টিকেট কিনে এখানে ঢুকে পড়ুন। ঝুলন্ত সেতু ধরে যতই সামনে এগুবেন ততই ছবির মতো দৃশ্য আপনার দু চোখকে হাতছানি দিবে। সেতু পেড়িয়ে সামনের পাহাড়ে উঠে ইচ্ছে মতো ঘুরতে পারেন। ঝুলন্ত ব্রীজের ওপারের পাহাড়ের চূড়া থেকে দূর-দূরান্তের পাহাড়গুলো দেখা যায়। এখানে থাকতে পারবেন সন্ধ্যা অবধি। এখান থেকে কাপ্তাই লেকে নৌ ভ্রমণ করতে পারেন। নৌ ভ্রমণের জন্য এখানেই পেয়ে যাবেন নানা রকম বাহন। দশ জনের চড়ার উপযোগী ইঞ্জিন নৌকা প্রতি ঘন্টার জন্য ভাড়া ৪৫০ টাকা, ১৫-২০ জনের নৌকা প্রতি ঘন্টা ৬৫০ টাকা, স্পিড বোট প্রতি ঘন্টার জন্য ১২০০ টাকা আর আধা ঘন্টার জন্য ৬৫০ টাকা। ঘন্টা ১০০ টাকায় এখানে পাবেন পাঁচজনের চড়ার উপযোগী সাম্পানও। এ জায়গায় প্রথম দিনের ভ্রমণ শেষ করে হোটেলে ফিরে যান।

পরের পুরো দিনটি রাখনু কাপ্তাই লেক ভ্রমণের জন্য রাখুন। শহরের রিজার্ভ বাজার ঘাটেই পাবেন কাপ্তাই লেকে ভ্রমণের নানা রকম ইঞ্জিন বোট। ঝুলন্ত সেতুর কাছেও এরকম অনেক বোট পাবেন। সেক্ষেত্রে আপনাকে একটু বাড়তি টাকা গুনতে হবে শুধু শুধু। সারাদিনের জন্য একটি বোট ভাড়া করে সকালে সোজা চলে যান শুভলং বাজার। এখানে আর্মি ক্যাম্পের পাশ থেকে সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের উপরে উঠে দুচোখ ভরে দেখুন কাপ্তাই লেকের অপার সৌন্দর্য। তবে এখানে বানর থেকে সাবধান! এদের বিরক্ত করবেন না। বিরক্ত করলে ওরা কিন্তু আপনার উপরে চড়াও হতে পারে। শুভলংয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে এবার ফিরতে শুরু করুন। ফিরতি পথের শুরুতেই হাতের বাঁয়ে পেয়ে যাবেন শুভলং ঝরণা। এখন শীত বলে ঝর্ণায় পানি নেই বললেই চলে। তারপরেও অল্প-সল্প যা আছে তাতে শরীরটা ভিজিয়ে নিতে পারেন। কাপ্তাই লেকের দুপাশের আকাশ ছোঁয়া পাহাড়গুলোর সৌন্দর্য দেখতে দেখতে চলতে থাকুন। পথে দুপুরের খাবার সেরে নিতে পারেন টুক টুক ইকো ভিলেজ কিংবা পেদা টিংটিং এ। শুরুতেই পড়বে টুকটুক ইকো ভিলেজ। কাপ্তাই লেকের একেবারে মাঝে এই ইকো ভিলেজটির সুন্দর সুন্দর কটেজে রাতও কাটাতে পারেন। এর রেস্তোরাঁটিতে পাবেন বিভিন্ন রকম পাহাড়ি মেন্যু। সারাদিন কাপ্তাই লেকের এসব জায়গা ভ্রমণের জন্য একটি ইঞ্জিন বোটের ভাড়া পড়বে ১০০০-২৫০০ টাকা। এছাড়া রাঙামাটি শহর থেকে এখন প্রতিদিন শুভলং ছেড়ে যায় আধূনিক ভ্রমণতরী কেয়ারী কর্ণফুলী। প্রতিদিন সকালে ছেড়ে আবার বিকেলে ফিরে আসে। ফিরতি পথে টুক টুক ইকো ভিলেজ কিংবা পেদা টিংটিং এ থাকে বিরতি। যাওয়া আসার ভাড়া জনপ্রতি ২০০ টাকা।

কিভাবে যাবেন

ঢাকার কলাবাগান, ফকিরাপুল ও কমলাপুর থেকে সরাসরি রাঙ্গমাটির উদ্দেশে ছেড়ে যায় ডলফিন, এস আলম, সৌদিয়া, শ্যামলী ইত্যাদি পরিবহনের বাস। ভাড়া জনপ্রতি ৩৫০-৪৫০ টাকা। এছাড়া অন্যান্য বাস, ট্রেন কিংবা বিমানে চট্টগ্রাম এসে সেখান থেকেও রাঙামাটি আসতে পারেন। চট্টগ্রাম শহরের সিনেমা প্যালেস এবং বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতি বিশ মিনিট পর পর রাঙামাটির উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় বিরতিহীন বাস। ভাড়া জনপ্রতি ৬৫-৮০ টাকা।

কোথায় থাকবেন

রাঙামাটি শহরে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো হোটেল হলো হোটেল কাঠালতলীতে হোটেল সুফিয়া, ফোন- ০৩৫১-৬২১৪৫। রিজার্ভ বাজারে হোটেল গ্রীন ক্যাসেল, ফোন- ০৩৫১-৬৩২৮২ এবং পর্যটন কমপ্লেক্সের ভেতরে পর্যটন মোটেল, ফোন- ০৩৫১-৬৩১২৬। ঢাকা থেকে এ হোটেলেরও বুকিং দিতে পারেন। যোগাযোগঃ বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, ফোন- ৮১১৭৮৫৫-৯, ৮১১৯১৯২। এছাড়াও রাঙামাটির সাধারণ মানের কয়েকটি হোটেল হলোঃ রিজার্ভ বাজারে হোটেল লেক ভিউ, ফোন- ০৩৫১-৬৩৩৭৩, কোর্ট বিল্ডিং বনরূপা এলাকায় হোটেল শাপলা, ফোন- ০৩৫১-৬৩৩৯৬।

প্রয়োজনীয় তথ্য

বাংলাদেশের একমাত্র রিকশা মুক্ত শহর রাঙামাটি। তাই এই শহরের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয় বেবিটেক্সিতে। এক স্টপেজ থেকে আরেক স্টপেজে পৌরসভা নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়া হলো ১০ টাকা। এছাড়া রিজার্ভ নিলে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভাড়া ৬০-১০০ টাকা। রাঙামাটি শহর থেকে কিনতে পারেন আদিবাসিদের পোশাক, রাঙামাটির তাঁতের কাপড়, আদিবাসিদের তৈরি নানা রকম হস্ত শিল্প সামগ্রী ইত্যাদি।

আলোকচিত্র ও লেখা মুস্তাফিজ মামুন
সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ডিসেম্বর ১৫, ২০০৯