ঝকঝকে রাস্তার দুপাশ ধরে সারি সারি ক্রিসমাস ট্রি ও লাল পাতার চেস্ট নাটগাছ। কোথাও মাথা উঁচু করে পাশাপাশি বড় বিল্ডিং। এর ফাঁক গলে দূরে দৃষ্টি দিলে চোখে পড়বে গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধূসর পাহাড়। সবুজ প্রকৃতির যেখানে বড্ড অভাব। এক ফ্রেমে এ-ই হলো তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবের চিত্র।

তাজিকদের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে দুশানবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক ইতিহাস। নামটির পেছনেই আছে মজার ঘটনা। দুশানবে নামটি এসেছে সাপ্তাহিক দিন ‘সোমবার’ থেকে। কারণ, এই দিনটি সঙ্গে করেই তিল তিল করে শহর হয়ে উঠেছে আজকের দুশানবে।

বিংশ শতাব্দীর আগে ও পরে তিনটি গ্রাম নিয়ে ছিল এই অঞ্চল। গ্রামের মানুষ একত্র হওয়ার জন্য সাপ্তাহিক প্রতি মানডেতে (সোমবার) নির্দিষ্ট একটি জায়গায় হাট বা বাজার বসাত। এই মানডে থেকেই দুশানবে নামের উৎপত্তি। তাজিক ভাষায় মানডে শব্দের অর্থই দুশানবে। বর্তমানে ৯৮ শতাংশ মুসলমানের শহরে তাজিক ভাষার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যবহৃত হয় রাশিয়ান ভাষা।

দুশানবের শহরটা একেবারেই শান্ত বলা যায়। জনসংখ্যা খুবই কম থাকায় রাস্তাঘাট কোলাহলমুক্ত। ‘ট্রাফিক জ্যাম’ শব্দের সঙ্গে তাদের হয়তো কোনো পরিচয়ই নেই। এ ছাড়া যেকোনো সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করলেও কেমন যেন চোখ বড় বড় করে তাকায় তারা। নিজের শহরে কোনো সমস্যাই নেই বলে দাবি করলেন স্থানীয় এক পাঁচ তারকা হোটেলের ম্যানেজার জামশেদ মারাদিনোজ, ‘আমাদের শহরটা ছোট। কিন্তু অনেক শান্ত। কোনো সমস্যাই খুঁজে পাওয়া যাবে না। শান্তিতেই বাস করছি এবং সবাই আমরা একে অপরকে চিনি।’ স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বেশ সুখেই আছেন তিনি।

ব্যস্ত ঢাকার মতো শান্ত দুশানবেতে একটি পরিচিত দৃশ্য চোখে পড়ে। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে তরুণ-তরুণীরা ছুটছে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রয়োজনে দৌড়ে গিয়ে উঠছে বাসে। কথা হলো স্থানীয় নামকরা স্লোভেনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আজম ওলভিকের সঙ্গে। তাঁর মুখে শুধু দুশানবের গুণগান, ‘আপনি এখানে অনেক খুঁজলেও কোনো সমস্যা পাবেন না। রাতের বেলায়ও শহরটা অনেক নিরাপদ।’

তাজিকিস্তান নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাশিয়ার একটি ভূখণ্ডের কথা। স্বাধীনতার ১৫ বছর পরও তাজিকিস্তানকে অনেকে পরিচয় করিয়ে দেয় এভাবে, রাশিয়া থেকে ভাগ হয়ে মধ্য এশিয়ায় যে পাঁচটি দেশ সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে তাজিকিস্তান একটি। কোনো রকম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছাড়াই ১৯৯২ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা পায় তারা। কিন্তু এর পরে নিজেরাই গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পাওয়া যাচ্ছিল না স্বাধীনতার স্বাদ। সবকিছু পেছনে ফেলে এখন তারা সুখী ও সমৃদ্ধির পথে। রাজধানী দুশানবের চিত্রটাই দেবে সেই সাক্ষী।

সবচেয়ে ভালো লেগেছে, দুশানবে তার ঐতিহ্য ভোলেনি। ঢাকায় নির্বিচারে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা স্থাপনা ধ্বংস করা হচ্ছে। দেশ ছেড়ে এই দূর প্রবাসেও এসে খবর পেলাম, খামারবাড়ির ঐতিহাসিক এক ভবন ভেঙে ফেলা হচ্ছে। দুশানবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক হয়েছে যতটা সম্ভব। কিন্তু নিজের ইতিহাসকেও যত্ন করে রেখেছে।

রাশেদুল ইসলাম, তাজিকিস্তান থেকে
সোর্স – প্রথম আলো।