হুবুর্গেনের সাগরতীরে প্রকৃতির তৈরি মানুষের মুখ মূল ভূমি থেকে মাত্র ৯০ কিলোমিটার দূরে কাচস্বচ্ছ বাল্টিক সাগরে ভাসছে তিন হাজার ১৪০ বর্গকিলোমিটারের মাঝারি দ্বীপ গোতল্যান্ড। দ্বীপটি নিয়ে প্রাচীনকাল থেকেই কিংবদন্তি আছে। কোনো এক জাদুকরের মন্ত্রে দ্বীপটি প্রতি সন্ধ্যায় ভেসে উঠত, আবার প্রভাতের সঙ্গে সঙ্গেই সাগরের গভীরে তলিয়ে যেত। কিংবদন্তি আছে, দ্বীপের প্রথম বাসিন্দার নাম সেলভার, যিনি দ্বীপে এসে প্রথম আগুন জ্বালিয়েছিলেন। আগুনের আলো পেয়ে দ্বীপটি আর অদৃশ্য হয়ে যায়নি। কিন্তু কিংবদন্তি যা-ই বলুক, জোয়ার-ভাটার জন্যই যে দ্বীপটি সাগরে তলিয়ে গিয়ে আবার ভেসে উঠত, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতানুযায়ী, সাত হাজার বছর আগে থেকেই এ দ্বীপে মানুষ বাস করে আসছে এবং কালক্রমে দ্বীপটি বাল্টিক সাগরের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। সমগ্র দ্বীপটির জনসংখ্যা মাত্র ৫৮ হাজার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পূর্ণ দ্বীপটিতে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লাখ ভ্রমণকারী পরিদর্শনে আসে। স্টকহোম থেকে দ্রুতগামী ফেরিবোট বা আকাশপথে যাওয়া যায়। গোতল্যান্ডে গিয়ে যখন নামলাম, তখন দুপুর হয় হয়। গ্রীষ্মের আকাশে জ্বলজ্বলে সূর্য। চারদিকে সবুজের সমারোহ। মৃদুমন্দ হাওয়ায় সবুজের মাঝে মাঠঘাটজুড়ে দোল খাচ্ছে লাল পপি ফুল। পপি থেকে মাদকদ্রব্য উৎপন্ন হলেও শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেই দ্বীপটি জুড়ে পপি ফুলের ছড়াছড়ি। এমনটি অন্য কোথাও দেখিনি। উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথে চোখ জুড়ানো দৃশ্য, পপি ফুলের মিষ্টি সুবাস চারদিকে। গোতল্যান্ডে এসে হুবুর্গেনে যাননি এমন ভ্রমণপিয়াসী খুঁজে পাওয়া মুশকিল। হুবুর্গেনের সাগরতীরে প্রকৃতির তৈরি মানুষের মুখটি এক আশ্চর্য বিস্ময়! পাহাড়ের মাথার একটি অংশ বিশেষ একটি কোণ থেকে দেখলে মনে হয়, যুগ যুগ ধরে সাগরের দিকে তাকিয়ে আছে মাথায় টুপি পরা একটি মুখ। এ পাহাড়ের চূড়ায় সমুদ্রের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালে মনে হয়, সাগরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি। সে এক অব্যক্ত অনুভূতি।
গোতল্যান্ড দেখতে এসে দ্বীপটির মাথায় লেগে থাকা ছোট ভূখণ্ডটিকে অবহেলা করা যায় না। সমুদ্রে ভেসে থাকা খণ্ডটির নাম ‘ফোরও’ অর্থাৎ ভেড়ার দ্বীপ। দ্বীপে পাহাড়ের কোলে প্রচুর ভেড়া সবুজ উপত্যকায় চরে বেড়ায়। ভেড়ার সংখ্যাধিক্যেই দ্বীপটির নাম ফোরও বা ভেড়ার দ্বীপ। সুইডিশ ভাষায় Får (ফোর) শব্দের অর্থ ভেড়া। দ্বীপটির মধ্যে এমনও জায়গা আছে, যেখানের গাছপালা মাটি থেকে মাত্র এক বিঘত উঁচু, ছোট ছোট গাছ কাদাময়। দেখে মনে হয়, দ্বীপের এই অংশটি এইমাত্র সাগরের তল থেকে উঠে এসেছে।
ফোরওতে যেতে হলে গোতল্যান্ড থেকে ফেরিতে পার হয়ে যেতে হয়, তবে সামরিকভাবে ছোট দ্বীপটির বিশেষ গুরুত্ব থাকায় সুইডিশ নাগরিক ব্যতীত অন্য কারও জন্য দ্বীপটির দ্বার উন্মুক্ত নয়।
ফোরওর আয়তন মাত্র ১১১ দশমিক ৩৫ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ৬০০-এর কম। দ্বীপটিতে কোনো ব্যাংক, পোস্ট অফিস, মেডিকেল সার্ভিস ও পুলিশ স্টেশন নেই, তবে দ্বীপটির রয়েছে নিজস্ব বাচনভঙ্গি, যা সুইডিশ ভাষায় প্রাচীনতম। আয়তনে ফোরও ছোট হলেও বিশ্ববাসীর কাছে দ্বীপটি সমধিক পরিচিত। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সুইডিশ চলচ্চিত্র পরিচালক ইঙ্গমার বার্গম্যান প্রাকৃতিক মোহে আবিষ্ট হয়ে এই দ্বীপেই বাস করেছেন দীর্ঘ ৪০ বছর এবং মৃত্যুর পর তাঁকে এই দ্বীপেই সমাহিত করা হয়। বার্গম্যানের বিখ্যাত তিনটি ছবির শুটিং হয়েছে এই দ্বীপে। এগুলো হচ্ছে পারসোনা, শেইম ও দ্য প্যাশন অব আনা। ফোরও দ্বীপবাসীদের জীবনযাত্রা ও দৈনন্দিন কর্মধারা নিয়ে বার্গম্যান তৈরি করেছিলেন আরও দুটি তথ্যচিত্র ফোরও ডকুমেন্ট ১৯৬৯ ও ফোরও ডকুমেন্ট ১৯৭৯। ফোরও দ্বীপবাসী এ সিনেমাগুরুকে পেয়েছিল তাদের একান্ত আপনজন হিসেবে।
বার্গম্যানের বসতবাড়ি বলতে আছে চারটি আলাদা ভবন। মূল ভবনটির নাম হামারস। সামনে আদিগন্ত সাগর নিয়ে দুই কক্ষের লেখার ঘর। এ ঘরেই চিত্রায়িত হয়েছিল বার্গম্যানের বিখ্যাত সিনস ফ্রম এ ম্যারেজ ধারাবাহিকের শেষ দৃশ্য। ২০০৭ সালে ৮৯ বছর বয়সে মারা যান বার্গম্যান। গত বছর নিলামে উঠেছিল এই দ্বীপে অবস্থিত তাঁর নিজস্ব বসতবাড়ি। অনেক জল্পনা-কল্পনা শেষে বার্গম্যানের এই বসতবাড়িতে এখন একটি জাদুঘর তৈরি করা হয়েছে।
ফোরওর সাগরসৈকতে প্রাচীনকাল থেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পাথর আর পাথর। পাথরের ওপর পা ফেলে ফেলে যাওয়া যায় সমুদ্রের বেশ গভীরে। মৃদুমন্দ হাওয়ায় নীল স্বচ্ছ জলে পা ডুবিয়ে বসা যায় পাথরের ওপর। আর হ্যাঁ, ডুবন্ত পায়ের পাতায় সাগরের ছোট মাছগুলো আলতো চুমু দিয়ে যাবে বইকি!

লিয়াকত হোসেন
স্টকহোম, সুইডেন
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মার্চ ২০, ২০১০