বৃষ্টিভেজা গ্রামের পথে

‘আষাঢ়-শ্রাবণ মানে না তো মন’। চলছে শ্রাবণের ধারা। রাতে বৃষ্টি, সকালেও বৃষ্টি—বিকেলে দেখলাম প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি। শত ব্যস্ততার ফাঁকে একটু অবকাশ চাইছে মন।। তার মানে, মন চাইছে গ্রাম্য পরিবেশ। শহরের খুব কাছে আছে গ্রাম। গাবতলী থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার। গাবতলী আমিনবাজার পার হলেই হেমায়েতপুর, তার পরই সিংগাইর। হেমায়েতপুর গেলেই চোখে পড়বে অনেক বড় কাঁচাবাজার। এই রাস্তা সোজা চলে গেছে সাভার-আরিচা। আর আমরা যাই হাতের বাঁয়ে। প্রায় এক কিলোমিটার সামনে গেলেই দুটি রাস্তা। বাঁয়ে গেলে ঋষিপাড়ার নতুন ট্যানারি অঞ্চল। আর ডানে যে রাস্তাটি গেল, সেই রাস্তা ধরেই সামনে যাই। বাঁয়ে তাকালেই চোখে পড়ে তেঁতুলঝড়া কলেজ। অনেক বড় খোলা মাঠ, খোলা আকাশ, পাশেই কৃষিজমি। দেখা যায়, কৃষক মাঠে কাজ করছেন। কলেজের পাশ দিয়েই হাতের বাঁয়ে একটু এগিয়ে গেলেই ভাষা শহীদ রফিকের নামেই ধল্লা সেতু। পার হওয়ার জন্য টোল দিয়ে চলে আসি সেতুর ওপর। উঠে দাঁড়ালাম, দখিনা হাওয়া। বহুদূর থেকে বয়ে আসছে ঠান্ডা বাতাস। গা জুড়িয়ে যায়। নদীর শেষ কোথায়, দেখে বুঝতে পারলাম না। এলাকার শিক্ষক জুয়েলের কাছে জাতে চাই, এই নদীর নাম কী? নদীর নাম ধলেশ্বরী। এই নদীপথটি দিয়ে টঙ্গী থেকে সদরঘাট যাওয়া যায়। এই নদীতে একসময় নৌকাবাইচ হতো, এখন আর হয় না। সেতু থেকে দুই দিকে তাকালেই চোখে পড়ে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য। সেতুর একপাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ উপভোগ করি সুন্দর এই প্রকৃতির খেলা। আকাশের রঙিন আলোয় চলছে ভেলা। সেতু থেকে হাতের ডানে তাকালেই দেখা যায়, একটু দূরে কাঠের বাগান। ওই গ্রামটির নাম গুচ্ছগ্রাম। একটু কষ্ট করেই ঘুরে এলাম কাঠবাগান থেকে।

এবার চলতে শুরু করলাম গ্রামে। সেতু পেরিয়ে আধা কিলোমিটার গেলেই চোখে পড়ে গ্রাম। শহরের পাশে এত সুন্দর গ্রাম! অপূর্ব! রাস্তার দুধারে গাছ। প্রায় পুরো রাস্তায় ছায়া দিয়ে আছে গাছগুলো। কলাগাছ, আমগাছ, কাঁঠালগাছ, কড়ইগাছ, মেহগনিগাছ, বাঁশ ছাড়াও আরও অনেক গাছগাছালি। রাস্তার বাঁ পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট খাল। খালে আছে কচুরিপানা। টলটলে পানি। কোথাও দেখা যায় পাট পচানোর দৃশ্য। এই খালের পাশে খুঁটিতে দেখতে পাই বিচিত্র রকমের পাখি। রাস্তা ধরে এগিয়ে যাই। আর দুধারে চোখে পড়ে কৃষিজমি। যেখানে চাষ করা হয়েছে পাট, ধান, সবজি, আখ, ধনচেসহ নানা ফসল। পাট খেতের দিকে তাকালে দেখা যায়, নিচের দিকে পাতা ঝরা, ফকফকা সুন্দর। খালের মধ্যে কয়েকজন মিলে পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছেন। আর ওপরে কচি পাতাগুলো দেখতে চা-বাগানের মতো। একটু বাতাস এলেই ঢেউ খেলে পাটের পাতা। আবার একটু সামনে একটি বাঁশের পুল পার হয়ে যাই বাড়ির মধ্যে গাঁয়ের এক মেয়ে আমাদের পানি খাওয়ায়। ভিন্ন মজা, অনেকের ছোটবেলার নস্টালজি। ছোট ছোট বাজার, সব বাজারে খাবার পেলেও একটু ভালো খাবার পাওয়া যায় জয়মণ্ডপ বাজারে। জয়মণ্ডপ থেকে ছোট্ট সেতু পার হয়ে বাঁয়ে গেলে বাটিগ্রাম। দেখা যায়, কৃষকের মেয়েটি ও কিষাণী মুড়ি ভাজছেন দুদিন ধরে। এই মুড়ি খাবে ছয় মাস। আমাদের মুড়ি খেতে দেন। আগুনের তাপে কালো হয়ে গেছে। সেদিকে নজর দেওয়ার সময় নেই। পাশের বাড়ির ছোট্ট মেয়েটি বনবাদাড় থেকে ঝুড়িতে করে লাকড়ি টোকায় নিয়ে আসছে রাতের রান্নার জন্য। রাখাল ছেলেটি গরু-বাছুর নিয়ে ফিরছে বাড়ি। পাশের আরেকটি বাড়ির মাঝখানে তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে। আর সেই গাছে বাসা বুনেছে বাবুই পাখি। বেলা শেষ হওয়ার আগেই ঘুরে আসি শহীদ রফিক স্মৃতি জাদুঘর, রামনগর রাজবাড়ী, কণ্ঠশিল্পী মমতাজের চক্ষু হাসপাতাল। বেলা শেষে আবার ফিরে আসি শহরে। আসতে হয় একই পথে, সেতু পার হয়ে। আর যে দৃশ্য চোখে পড়বে, তা হলো সবজিবাগান। কৃষক সবজি তুলে নিয়ে আসছেন বাজারে। কৃষকের হাত থেকে কেনা যায় টাটকা সবজি। আরও পাওয়া যায় ফরমালিনমুক্ত তাজা মাছ, গাছের পাকা ফল।

যাবেন কীভাবে
ভাবছেন, এত সুন্দর গ্রামে যাব কীভাবে। যদি নিজস্ব বাহন থাকে, তবে তো কথাই নেই। নিজস্ব বাহন না থাকলে আপনি যেতে পারেন সিএনজি বা ট্যাক্সিক্যাবে। আর যদি সে সুযোগও না হয়, তবে গাবতলী থেকে পাবেন বাস। গাবতলী থেকে সিংগাইর বা হরিরামপুরের বাসে উঠে পড়বেন। নামতে পারেন বানিয়ারা, জয়মণ্ডপ বা সিংগাইর। রাত্রিযাপনের কোনো সুযোগ নেই। তাই ঘোরা শেষে ফিরে আসতে হবে আপন ঠিকানায়।

খালেদ সরকার
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, আগস্ট ১০, ২০১০

Sending
User Review
0 (0 votes)

Add Comment