বাঘের পিছু পিছু

মনিরুল খান পেশায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। বাঘ নিয়ে গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর পড়াশোনার খাতিরে। সুন্দরবনের বাঘ নিয়েই তাঁর কাজ-কারবার। গবেষণার প্রয়োজন আর নেশার টানেই নেমেছিলেন সুন্দরবনের বাঘের ছবি তোলার কাজে। বাঘ দেখা, বাঘের ছবি তোলার রোমাঞ্চকর গল্প তাঁর কাছ থেকে শুনে লিখেছেন রাজীব হাসান

ঃ বুঝলি তো, ঢুকতেই দেখি প্রকাণ্ড এক বাঘ! বাঘটা ঠিক আমার দিকেই চেয়ে আছে। আমার তো রক্ত হিম হওয়ার জোগাড়!
-তারপর? তারপর?
ঃ আমি গুটি গুটি এগোলাম বাঘের দিকে, বাঘটাও এগোচ্ছে আমার দিকে। আমি এগোচ্ছি, বাঘটাও। আমি এগোচ্ছি, বাঘটাও এগোচ্ছে···
-বলিস কী! তারপর?
ঃ তারপর আর কি, আমি চিড়িয়াখানার অন্য আরেকটা খাঁচার দিকে এগিয়ে গেলাম।
এই নাকি গড়পড়তা বাঙালির বাঘ-দর্শন! বন্ধু মহলে নিজের বাঘ দেখার গল্প জাহির করা। তবে সবাই তো আর এমন গপ্পবাজ নয়। কেউ কেউ সত্যি সত্যিই নিজের চর্মচক্ষে পৃথিবীর অন্যতম ভয়ঙ্কর সুন্দর এই প্রাণী দেখেছেন। লোহার শিকে বন্দী অসহায় বাঘ নয়, অবাধে নিজের রাজ্যে দুলকি চালে ঘুরতে দেখা বাঘ। শিকারসন্ধানে ঘাপটি মেরে থাকা বাঘ। জলার ধারে দুপুরের অলস রোদ্দুরে গা এলিয়ে দেওয়া বাঘ। দেখেছেন আর শিউরে উঠেছেন। মুগ্ধও হয়েছেন বৈকি!
যেমন মুগ্ধ ড· মনিরুল খান, পেশায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। পেশাগত একটা দায় তো ছিলই। সুন্দরবনের বাঘ নিয়েই তাঁর কাজ-কারবার। বাঘ কী খায়, কোথায় থাকে, বাঘের শিকারপ্রাণী থেকে বাঘের সংখ্যা-বাঘ নিয়ে এমন আদ্যোপান্ত গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর পড়াশোনার খাতিরে।
পিএইচডি শেষ হয়েছে ২০০৪ সালে। এরপর জুওলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডনের সঙ্গে সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে কাজ করছেন আজও। কিন্তু শুধু কেতাবি পড়াশোনার জন্য নয়, পেশাগত দায় থেকেও নয়; সুন্দরবনের গহিনে বাঘের সন্ধানে তাঁর একেকটি রাত, প্রতিনিয়ত ওত পেতে থাকা বিপদ অস্বীকার করে কাটানো এবং প্রতিদিন ঘামসিক্ত দিনের পেছনে কাজ করেছে বাঘের প্রতি ভালোবাসা। বরং বলা ভালো-নেশা থেকে।
এই নেশা তাঁর রক্তেই। পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে! বাপ-দাদারা ছিলেন শিকারি! না, বাঘ শিকার নয়। তবে সময়-সুযোগ পেলে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দোনলা বন্দুক নিয়ে বাবা আর বড় ভাইয়েরা বেরিয়ে পড়তেন পাখি শিকারে। বন্দুকের ভার নেওয়ার বয়স তাঁর তখন হয়নি।
আরও পরে কৈশোরে মনিরুলের নিত্যসঙ্গী তখন জিম করবেট! সেই কবে গত হওয়া এই সাহেব তো আর সশরীরে হাজির হতেন না। তবে মানুষখেকো বাঘ শিকারে স্বনামধন্য এই ব্রিটিশ শিকারির লেখা কুমায়নের মানুষখেকো যে কতবার পড়েছেন! প্রতিটি পৃষ্ঠায় ঠাসা রোমাঞ্চ তাঁকে যেন টেনে নিয়ে যেত পাহাড়ঘেরা সেই বনাঞ্চলে। করবেটের সঙ্গে সঙ্গে তিনিও যেন নিশুত রাতে ঘাপটি মেরে বসে থাকতেন মানুষখোকোটাকে শেষ করে দিতে।
গল্পের একটা বড় জোগান দিতেন বাবাই। প্রথম চাকরিজীবনটাই বাবার শুরু হয়েছিল মধুপুরগড়ে, সেই ১৯৪৮-৪৯ সালে। তখন বাঘের জগৎটা এত ছোট হয়ে আসেনি। মানুষও এমন সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠেনি। আর তাই মধুপুরের জঙ্গলেও দেখা মিলত বাঘের। শুধু করবেট সাহেব কেন? এই বাংলার পচাব্দী গাজীর বীরত্বও যে তাঁর মুখস্থ।
শৈশবে যাঁর স্বপ্ন ছিল বাঘ শিকারের, কল্পনায় এঁকে নেওয়া দোনলা বন্দুকের ট্রিগারে স্থির থাকত যাঁর আঙ্গুল; সেই মনিরুল এখন ট্রিগারের বদলে আঙ্গুল রাখেন ক্যামেরার শাটারে। সাটাসাট তুলে নেন বাঘের ছবি। তাঁর বাঘ দেখা, বাঘের ছবি তোলার গল্পই শুনব আমরা। যে গল্পের পরতে পরতে যেমন মিশে আছে রোমাঞ্চ, আছে জীবনসংকটে পড়ে যাওয়ার রোমহর্ষকতা; তেমনি আছে অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যাওয়া বিপন্ন এক প্রাণীর প্রতি তাঁর ভালোবাসাও!

প্রথম দেখা
‘সুন্দরবনে যতবার গিয়েছি, প্রতিবারই চোখজোড়া খুঁজে বেরিয়েছে কালো ডোরা। কত কিছু দেখেই না প্রথমে বাঘ ভেবেছি! পরে ভুল ভেঙেছে। অবশেষে এল সেই দিন।’ মনিরুল নড়েচড়ে বসলেন তাঁর প্রথম বাঘ-দর্শনের গল্প শোনাতে। যেন ইট-কাঠের কংক্রিটের এই জঞ্জালঘেরা শহরে নেই তিনি, চলে গেছেন সবুজ-সুন্দর সুন্দরবনে।
২০০১ সালের আগস্ট। দুপুর। মাথার ওপর গনগনে সূর্য ঠিকই গেওয়া-গরান-কেওড়া গাছের আড়াল দিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে জানান দিচ্ছে নিজের অস্তিত্ব। এমনিতে জুন থেকে অক্টোবরে এখানে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ থাকে অনেক বেশি। ভাপসা গরমে ঘেমে-নেয়ে সবাই একশা।
সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে মনিরুল নেমেছেন সুন্দরবনের দক্ষিণ-পূর্বের কটকা পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের জেটিতে। সেখান থেকেই প্রায় ঘণ্টা খানেকের হাঁটাপথে এগোচ্ছেন বনের ভেতর। এক ঘণ্টার পথ। কিন্তু মনিরুলের মনে হচ্ছে, ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’। সুন্দরবনের ভেতরের হাঁটাপথ সুন্দর নয় মোটেও। থিকথিক-গিজগিজে কাদা। তার ওপর আবার ম্যানগ্রোভ বন হওয়ায় গাছের শেকড় থেকে উঠে আসা শাসমূলের কারণে পা ফেলাই দায়।
মনিরুলের পিঠে ঝোলানো ব্যাগ। গলায় ক্যামেরা। সেই ক্যামেরার শাটারে সদাসতর্ক আঙ্গুল। কপালের ঘামটুকুও মোছার ঝুঁকি নিচ্ছেন না। পাছে দুর্লভ কোনো ছবি হাতছাড়া হয়! সত্যি সত্যিই দুর্লভ একটা ছবি পেয়ে গেলেন-লাল মাছরাঙা। জুম করে সেই মাছরাঙার গোটা দুই ছবি তুলেছেন কি তোলেননি, এমন সময় পাশের সরু খালের ওপার থেকে ভেসে এল গর্জন, ‘হা-উ-উ!’ বাঘ তো আর বইপত্তরের ভাষায় ঠিক ‘হালুম’ করে ডাক ছাড়ে না। এই ‘হা-উ-উ’ শুনেই মনিরুলের দল বুঝে গেল, বিপৎসীমার ভেতর ঢুকে পড়েছে তারা।
‘বাঘের পিলে চমকানো ডাক শুনে আমরা তো সবাই পড়িমরি দে ছুট। যে পথে যেতে আমাদের এক ঘণ্টা লেগেছিল, ফিরে এলাম মাত্র ২০ মিনিটে! এসেই সোজা উঠে পড়লাম টাওয়ারে’-যেন এইমাত্র ঘটল সেই ঘটনা, মনিরুলের কণ্ঠে সেই উত্তেজনার কাঁপন।
একটু পরে বাঘের সঙ্গিনীও আওয়াজ তুলে জানান দিল অস্তিত্ব। এভাবেই পুরুষ আর স্ত্রী বাঘ ডাকাডাকি করতে করতে একে-অন্যের কাছে আসে। এমনিতে শরৎ থেকে হেমন্তের পূর্ণিমা-অমাবস্যা বাঘের প্রজনন সময়। স্থানীয় বাসিন্দারা একে বলে ‘স্যাঁড়াসাঁড়ির কোটাল’। এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে, বাঘিনীর ডাক নকল করে পচাব্দী গাজী যে কত বাঘ শিকার করেছেন!
গাজী সাহেবের বুদ্ধিটাই কাজে লাগালেন মনিরুল আর তাঁর সঙ্গী আখতারুজ্জামান কামাল। লঞ্চ থেকে আনলেন একটা মাটির হাঁড়ি। সেটার ভেতর মুখ ঢুকিয়ে দিলেন বাঘের ডাক। খানিকক্ষণ পরই শনের ঝোপ থেকে উঁকি দিল প্রকাণ্ড এক হলুদ মাথা। অলস চাহনিতেও যেন ফুটে বেরোচ্ছে বিরক্তি। ‘মামা’ যেন বলতে চাইছেন, ‘কে রে তুই!’
‘প্রথমবার বাঘ দেখার আনন্দে আমি তো ধেই ধেই নাচতে শুরু করলাম। মনে আছে, ঢাকায় ফিরে গিয়ে রীতিমতো কেক কেটে বন্ধুদের সঙ্গে উদ্‌যাপনও করেছিলাম,’ টেন্ডুলকারের সেঞ্চুরি উচ্ছ্বাসই যেন খেলে গেল মনিরুলের কণ্ঠে।

বাঘের পিছু পিছু
বাঘ দেখে মনিরুলের উচ্ছ্বাস বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে অনেকের কাছে। কিন্তু অভিজ্ঞরা ভালো করেই জানেন, সুন্দরবনে যাওয়া মানেই তো আর বাঘ দেখার নিশ্চয়তা নেই। এমন নয়, পর্যটনশিল্পের কথা ভেবে বাঘ মামারা সেজেগুজে অপেক্ষা করছে আপনার জন্য! বরং এমন অনেকেই দুর্ভাগা (নাকি সৌভাগ্যবান?) আছেন, সুন্দরবনে অজস্রবার পাড়ি জমিয়েও বাঘের লেজটুকুও দেখার ভাগ্য যাঁদের হয়নি। সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে কেবল বাঘের পায়ের ছাপ দেখে ফিরেছেন। তখন ওই কৌতুক না বলে আর কী উপায়!
প্রথমবার বাঘ দেখার আনন্দেও একটা ঘাটতি থেকে গিয়েছিল মনিরুলের। সেবার যে ছবি তোলা হয়নি। এবার তাই পুরো আয়োজন করেই রেখেছিলেন। কিন্তু বাঘ বুঝি মন্ত্রবলে টের পেয়ে গেছে অভিসন্ধি। কিছুতেই তার দেখা মেলে না। বেগার খাটুনিতেই সার। অবশেষে মুখ তুলে চাইল যেন ভাগ্যদেবী।
‘কটকা শনের মাঠে শুকনো বালুর ওপর পায়ের ছাপ পেলাম। টাটকা ছাপ। শুধু তা-ই নয়, ছাপ দেখেই বোঝা যাচ্ছে বাঘটার আকার বেশ বড়। আমার অনুমান সত্যি হলো খানিক পরই। দূরে হালকা গজিয়ে ওঠা শনের ভেতর দিয়ে অলস ভঙ্গিতে এগিয়ে যাচ্ছে প্রকাণ্ড এক পুরুষ বাঘ। সুন্দরবনে আমার দেখা এটাই সবচেয়ে বড় বাঘ’-২০০১ সালের অক্টোবরে ফিরে গেলেন মনিরুল।
শুধু বাঘ দেখে তৃপ্ত হবেন না বলেই পণ করেছিলেন। কিন্তু ভালো ছবি তো আর চাইলেই মেলে না। জুতসই একটা অ্যাঙ্গেল মিলছিল না। বাঘ হাঁটছে সামনে, আর তারা পেছনে। বেশ ভাবুক স্বভাবের বাঘ। আশপাশের কোনো কিছুতে ভ্রুক্ষেপ নেই। মনিরুলের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল, যখন দেখলেন ফিল্ম শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। আরেকটাই ছবি তোলা যাবে।
কিন্তু এবার আর বাঘের ছবি না তুলে ফিরবেন না। এই জেদটাই একটা ঝুঁকি নিতে প্রবৃত্ত করল। ক্যামেরা তাক করে জোরে শিস্‌ দিয়ে উঠলেন। কাজ হলো। একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাঁর দিকে তাকাল বাঘ। কিন্তু দারুণ একটা ছবি তোলার আত্মতৃপ্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কারণ বাঘ যে তখনো চেয়ে আছে!
বাঘ দেখে দৌড়ে পালানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এতে বাঘের মধ্যে শিকার করার স্পৃহা জেগে উঠতে পারে। আর বাঘের সঙ্গে দৌড়ে পাল্লা দেওয়া পৃথিবীর দ্রুততম মানবেরও সাধ্যি নেই। কপাল ভালো, ভাবুক বাঘের ‘মুড’ বোধ হয় ভালো ছিল সেদিন। এক লাফে হারিয়ে গেল ঝোপের আড়ালে। সেবার ওই বাঘের দেখা আরও একবার পেয়েছিলেন মনিরুল। সহাস্যে জানালেন, ‘দেখেই চিনেছি, সেটা আগের বাঘটাই ছিল। বাঘটাও নিশ্চয়ই চিনেছে, আমি সেই ফটোগ্রাফার!’

ঝড়ের কবলে, বাঘের মুখে
নিজেকে লুকিয়ে রাখার ক্ষমতা প্রকৃতির কাছ থেকেই পেয়েছে বাঘ। ছোট্ট একটা ঝোপের ভেতরেও কী অনায়াসে নিজেকে আড়াল করে রাখতে পারে সে! মুহূর্তের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে যায়। আছে হামাগুড়ি দিয়ে শরীরটাকে ছোট করে ফেলার অবিশ্বাস্য ক্ষমতাও।
মনিরুলের এই অভিজ্ঞতাটা মোটামুটি টাটকা। ২০০৮ সালের অক্টোবর। সেদিন উত্তাল ঝড়-‘এক শ বনের বাতাস এসে/একটা গাছে হলুস্থুলু’। মনিরুলদের লঞ্চ তখন কচিখালীর পাশে বলেশ্বর নদের মোহনায়। সুন্দরবনের মুসাফিরি তাঁকে অনেকবারই গোখরা সাপের মুখোমুখি করিয়েছে। কিন্তু এবার দেখলেন সাপের মতো ফণা তোলা উন্মত্ত স্রোতের তাণ্ডব। নিস্তরঙ্গ বলেশ্বর যেন ফুঁসে উঠেছে অক্নাৎ!
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি কিছুটা ক্লান্ত হয়ে জিরোচ্ছিল বোধ করি। কিন্তু ঝোড়ো হাওয়ার বিরাম নেই। ওই অবস্থাতেই নৌকা নিয়ে খালে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিলেন মনিরুল। কিন্তু এই বেলা সঙ্গী হিসেবে খুব বেশি কাউকে পেলেন না। বাকিদের লঞ্চের নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে তাঁরা রওনা হলেন।
প্রকৃতির আক্রোশ থেকে রক্ষা পেতে বনের পশু-পাখিও বুঝি লুকিয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ে। ঝড়ের দাপটে মাথা ভেঙে একটা কেওড়াগাছ হেলে পড়ে আছে খালের ওপর। পাতাগুলোকে মনে হচ্ছিল যেন সবুজ একটা ঝালর। কিন্তু বাঘের দেখা মিলবে তো? সময় বাড়ে। পাল্লা দিয়ে বাড়ে সংশয়। ‘একসময় মনে হলো, ধুর, লঞ্চেই ফিরে যাই। ঠিক তখনই সেই ঝালরের আড়াল থেকে উঁকি দিল একটা বাঘের মাথা। চোখ-নাক বাঁকিয়ে নিঃশব্দে সাঁতরে খাল পার হচ্ছিল বাঘটা। লঞ্চে ফিরে গিয়ে যখন সঙ্গীদের জানালাম, তাদের সে কী আফসোস!’

কৌতূহলী সেই মুখ
বড় অদ্ভুত নাম খালটির-সাপের খাল। সার্থক নামকরণ। শুধু সাপের মতো আঁকাবাঁকাই নয়। এই খালে সাপও বিস্তর। ২০০২ সালের মার্চ। সেই সাপের খালের ওপর দিয়ে ডিঙি নৌকা বেয়ে এগিয়ে চলছেন মনিরুলরা। জায়গাটা সুন্দরবনের পূর্ব প্রান্তে প্রমত্ত বলেশ্বর নদের কাছেই। সুন্দরবনের এই জায়গার লবণাক্ততা সবচেয়ে কম বলে এখানকার সুন্দরী গাছগুলোও হয় বড় বড়।
সাপের খাল একটাই আঁকাবাঁকা, বাঁক নেওয়ার আগ পর্যন্ত সামনে কিছুই দেখা যায় না। আর তাই হুট করে সেদিন তাঁদের মুখোমুখি হতে হয়েছে ছোট্ট এক বাঘের। শুধু আকারেই নয়, বয়সও কম। কুকুরের চেয়ে কিছুটা বড়। এই বয়সী বাঘদের হরিণ-শূকর শিকার কম্ম নয়। আর তাই এরা খালের মাছ ধরে খায়।
এর আগে সেই বাঘ মানুষ দেখেছে কি না কে জানে। নৌকা দেখে তাই খানিকটা পিছিয়ে গেলেও পালিয়ে গেল না। দূরত্ব কমতে কমতে প্রায় ১৫ ফুটের কাছাকাছি নেমে এল। চাইলে সেই বাঘ অনায়াসে লাফ দিয়ে উঠতে পারে নৌকায়। কিন্তু সেই বাঘের চাহনিতে হিংস্রতা ছিল না। ছিল অপার কৌতূহল। হয়তো বয়সটাই ছিল শিশুসুলভ মুগ্ধতার, বি্নয় হওয়ার। আর তাই সেদিন সেই কৌতূহল হয়ে অপলক দেখেছে ‘মানুষ’ নামের অদ্ভুত প্রাণীদের!

সূত্রঃ প্রথম আলো, জুলাই ১১, ২০০৯

Sending
User Review
0 (0 votes)

Add Comment