বাইকে চেপে ভারত ভ্রমণ

বাংলাদেশের তরুণ দম্পতি সাজেদুর রহমান ও রাহিমা আক্তার মোটরবাইকে চেপে ঘুরে এসেছেন ভারতের ৮ রাজ্যের ২০টি অঞ্চল। গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে ৩১ দিনে তাঁরা পাড়ি দিয়েছেন ৯ হাজার কিলোমিটার পথ। পড়ুন তাঁদের রোমাঞ্চকর ভ্রমণের গল্প।

একনজরে
ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন:
রাহিমা আক্তার ও মো. সাজেদুর রহমান
গন্তব্য: ভারত
ভ্রমণের সময়কাল: ৩১ দিন (২৭ নভেম্বর থেকে
২৭ ডিসেম্বর ২০১৭)
ঘুরেছেন: ৮টি রাজ্যের ২০টি অঞ্চল
পাড়ি দেওয়া পথ: প্রায় ৯ হাজার কিলোমিটার
ভ্রমণ-পথ: বুড়িমারী-শিলিগুড়ি-কলকাতা-আসানসোল-আওরঙ্গবাদ-রাক্সোল-গোরাখপুর-লক্ষ্ণৌ-আগ্রা-দিল্লি-শিমলা-কুফরি-পাঞ্চকুলা-চণ্ডীগর-লুধিয়ানা-জম্মু-চেনানি-শ্রীনগর-তাংমার্গ-শ্রীনগর-গাগানগীর-শ্রীনগর-জম্মু-লুধিয়ানা-দিল্লি-লক্ষ্ণৌ-বানারস-আসানসোল-শিলিগুড়ি-বুড়িমারী-লালমনিরহাট-রংপুর-ঢাকা
ভ্রমণের খরচ: ৭৯ হাজার টাকা (থাকা-খাওয়া এবং মোটরসাইকেলের জ্বালানিসহ)

বিয়ের আগে মোটরসাইকেলের ব্যাপারে ভীষণ অ্যালার্জি ছিল রাহিমা আক্তারের। ২০১৫ সালে বিয়ে করলেন মো. সাজেদুর রহমানকে। কিছুদিনের মধ্যেই একটা মোটরবাইক কিনলেন সাজেদুর। রাহিমা আক্তারের ভাষায়, ‘একেই বলে কপাল! যে মোটরসাইকেলে চড়তে খুব অনীহা ছিল, সেই মোটরসাইকেলে চেপেই আমরা একদিন চলে গেলাম শ্রীমঙ্গলে! বিয়ের পর সেটাই ছিল আমাদের প্রথম ঘোরাঘুরি।’
শ্রীমঙ্গল দিয়ে হলো শুরু। তারপর সরকারি চাকরিজীবী সাজেদুর ছুটি পেতেই স্নাতকপড়ুয়া স্ত্রীকে নিয়ে ছুটে গেলেন টেকনাফ, চুয়াডাঙ্গা, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, সন্দ্বীপ, কক্সবাজার কিংবা তেঁতুলিয়ায়। বাহন? অবশ্যই সেই মোটরসাইকেল।

ঢাকার খিলগাঁওবাসী এই দম্পতি লম্বা ছুটি না পেলেও মোটরসাইকেল-যাত্রায় নেমে পড়তেন প্রায়ই। সে ক্ষেত্রে গন্তব্যের নাম হতো মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ঘাট। ২৪ জানুয়ারি সাজেদুরের সঙ্গে কথা হচ্ছিল প্রথম আলো কার্যালয়ে। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে বলছিলেন, ‘দেশের ভেতর এই ভ্রমণগুলোই ছিল আমাদের অভিজ্ঞতা। আর মোটরসাইকেলে চেপে ঘুরতে আমাদের ভালো লাগতে শুরু করে। কারণ, এই বাহনটায় চেপে বসলে ইচ্ছামতো যাত্রাবিরতি দেওয়া যায়। প্রকৃতি বা এলাকাটার সংস্কৃতি উপভোগ করা যায় স্বাধীনভাবে। এ ছাড়া মোটরসাইকেল-যাত্রায় খরচও কম। তো এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একদিন ঠিক করি, মোটরসাইকেলে চেপে আমরা ভারত থেকে ঘুরে আসব।’

মোটরসাইকেলে চেপে ভারত-যাত্রার সাহস কেবল দেশের ভেতর ঘোরাঘুরি করেই হয়নি; অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন বাংলাদেশের আরও কজন বাইকার।

২৭ নভেম্বর ২০১৭: তবে একলা চলো রে

অনুপ্রেরণা আর সাহস থাকলেই তো হয় না, মোটরসাইকেলে চেপে ভিনদেশের রাস্তায় নামার অনেক ঝক্কি আছে, সামলাতে হয় সেসবও। সাজেদুর বলছিলেন, ‘ছুটি পাওয়ার জন্য অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। প্রায় আট মাস ধরে ছুটি, ভিসা এবং বিদেশে নিজস্ব বাহন নিয়ে যাওয়ার অনুমতিপত্রের (কার্নে দে প্যাসেজেস এন দুয়ান) জন্য ছোটাছুটি করতে হয়েছিল। তারপর মেরামত করতে হয়েছিল মোটরসাইকেলটাও। অবশেষে ২৭ নভেম্বর ঢাকা থেকে বের হলাম। পরদিন ২৮ নভেম্বর বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে নামলাম আমি ভারতের রাস্তায়।’

আমি! আমরা নয় কেন? যাত্রার শুরুতে সাজেদুর একাই ছিলেন। রাহিমার ভিসা এবং পরীক্ষার কারণে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন, তিনি যোগ দেবেন দিল্লি থেকে। ফলে তার আগ পর্যন্ত সাজেদুর গাইলেন—‘তবে একলা চলো রে’।

৪ ডিসেম্বর ২০১৭: ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু

বিহারে রাতে থাকা নিরাপদ নয় দেখে লক্ষ্ণৌর উদ্দেশে রওনা হন সাজেদুর। সারা রাত মোটরসাইকেল চালিয়েছেন। তখন সকাল, লক্ষ্ণৌ আর মাত্র ৭০-৮০ কিমি দূরে; সাজেদুরের শরীর ক্লান্ত, চোখে রাজ্যের ঘুম। রাস্তাটা যেন নিঃসঙ্গ, সুনসান আর ফাঁকা। সাজেদুরের কথায়, ‘এক লেন থেকে আরেক লেনে যাওয়া যায় চোখ বন্ধ করে।’ ফলে চোখের পলক ফেললে আর খুলতে ইচ্ছা করে না তাঁর। একবার বন্ধ করলে চোখ খোলে মোটরসাইকেলের ঝাঁকুনিতে। ওভাবে কয়েকবার ঘুমিয়েও পড়েছিলেন সাজেদুর! শেষেরবার তো রাস্তার বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম! সাজেদুর চোখ বড় বড় করে বলছিলেন, ‘পরে দেখলাম, এভাবে আর যাওয়া যাবে না। তাই একটু সামনে গিয়ে একটা ধাবাতে চা খেয়ে, চোখে-মুখে পানি দিয়ে ধাতস্থ হলাম। মোটরসাইকেল চালাতে চালাতে যে ঘুমিয়ে পড়ব, কখনো ভাবিনি!’

৮ ডিসেম্বর ২০১৭: বাহির হয়ে এসো তুমি

দিল্লির হিমাংশু তিওয়ারিও বাইকার। ছোটখাটো গড়ন, গোঁফজোড়া বিশাল, খুব আমুদে আর আন্তরিক হিমাংশুর সঙ্গে সাজেদুরের পরিচয় ফেসবুকে। দিল্লিতে গিয়ে খাতিরটা জমে উঠতে সময় নিল না। সাজেদুর বলছিলেন, ‘হিমাংশুকে বললাম, আজ আমার বউ আসবে, রাত একটার ফ্লাইটে। সে শুনেই বলল, “চলো তাহলে বিমানবন্দরে যাই।”’

মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন সাজেদুর ও হিমাংশু। বিমানবন্দরের সামনে এক চেকপোস্টে পথ আগলে দাঁড়াল পুলিশ। পুলিশের কর্তা হিমাংশুকে বললেন, ‘মোটরসাইকেলে অতিরিক্ত লাইট লাগিয়েছেন কেন? জানেন না, এখানে এই লাইট নিষিদ্ধ?’ এক দফা কথা-কাটাকাটি হলো। একপর্যায়ে হিমাংশু সাজেদুরকে দেখিয়ে বললেন, ‘ইয়ে বাংলাদেশ সে আয়া, আজ ইনকা বিবি আরাহি হ্যায়।’

পুলিশের কর্তা সাজেদুরের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে, হাসিমুখে বললেন, ‘ওয়েলকাম টু ইন্ডিয়া, স্যার!’ ব্যস, সে যাত্রা পার পেয়ে গেলেন হিমাংশু। মোটরসাইকেল দুটি রাখলেন তাঁরা পার্কিংয়ে। সেখানকার একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত রাতে কোনো ভিআইপি আসবে নাকি?’ সাজেদুর একটু হেসে বললেন, ‘জি, ভিআইপি নয় “ভিভিআইপি” আসছেন।’

রাহিমা বলছিলেন সেদিনের কথা, ‘মাহি (সাজেদুরের ডাকনাম) একা একা ঘুরছে, এটা ভাবলেই খুব কষ্ট হতো। কটা দিন দাঁতে দাঁত চেপে ছিলাম। দিল্লিতে যেদিন ওকে দেখলাম, মনে হলো, এর থেকে বড় আনন্দ আর হয় না!’

১২ ডিসেম্বর ২০১৭: বঁধু, মিছে রাগ কোরো না
শিমলা থেকে জম্মু—পাড়ি দিতে হবে ৫৪০ কিলোমিটার পথ। একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, আকাশ একেবারে অভিমানী বালিকার মতো থম মেরে আছে। বৃষ্টি যেন এই নামে সেই নামে অবস্থা। তার মধ্যেই সাজেদুর-রাহিমার মধ্যে হয়ে গেল একপশলা খুনসুটি! পথে থাকলে কী হবে, সংসার তো! লাজুক হেসে সাজেদুর বললেন, ‘দুজন একসঙ্গে থাকলে এক-আধটু তর্কবিতর্ক তো হবেই। মোটরসাইকেল-সংসারেও হয়েছিল। ঊর্মি (রাহিমা আক্তারের ডাকনাম) অভিমান করে কথা বলেনি, সেটা ভাঙাতেও হয়েছে।’ আর রাহিমা কী বলেন? উত্তর প্রায় একই রকম, ‘টুকটাক মতের অমিল তো হয়েছেই। তবে রাস্তায় নামলেই নতুন লক্ষ্য নিয়ে কথাবার্তা বলতে বলতে সব ঠিক হয়ে যেত।’

সব রাস্তা আবার ঠিক ছিল না। শিমলা থেকে পাঞ্চকুলা প্রায় ১১০ কিলোমিটারের পাহাড়ি পথ। তার ওপর মর্তে নেমে এসেছে মেঘ। কিচ্ছু ঠাওর করার উপায় নেই। ঠান্ডায় হাত জমে বরফ। পাঞ্চকুলার পর রাস্তাটা বেশ ভালো। সাজেদুর মোটরসাইকেলের গতি তুললেন ঘণ্টায় ৯০-১১০ কিলোমিটার। সামনে ফ্লাইওভার। সেখান থেকে নামতেই পুলিশের চেকপোস্ট। পুলিশ এসে বলল, ‘এত জোরে চালাচ্ছ কেন? লাইসেন্স দাও, মামলা করতে হবে।’

সাজেদুর সে যাত্রায় ‘বাংলাদেশ থেকে এসেছি, এখানকার সর্বোচ্চ গতিসীমা কত জানা ছিল না’ বলে ঢোঁক গিললেন। মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট দেখে সামান্য আক্কেলসেলামি দিয়ে ছেড়ে দিলেন পুলিশ কর্তা। রাহিমা বলছিলেন, ‘সেদিন সামান্য কেস খেয়েও খুশি লাগছিল! আমাদের কোনো ডকুমেন্ট তো ওরা রেখে দেয়নি সেদিন। নাহলে বিপদ ছিল!’

১৩ ডিসেম্বর ২০১৭: তোমার খোলা হাওয়া

‘খুব খুঁতখুঁতে স্বভাবের ও।’ সাজেদুর বলছিলেন তাঁর স্ত্রী রাহিমার কথা। ‘ময়লা কাপড় সে পরতে দেবে না। যাত্রার মধ্যেও সে ওয়াশিং পাউডার কিনে নিজের কাপড়ের সঙ্গে আমার কাপড়ও ধুয়ে দেবে। চেনানি থেকে সকালে বের হয়ে শ্রীনগরের দিকে রওনা দেব। আমার ইনার, হাইনেক টি-শার্ট আর এক জোড়া হাতমোজা খুঁজে পাচ্ছি না।’

পরে জানতে পারলেন, রাহিমা সেগুলো রাতে ধুয়ে দিয়েছেন। অগত্যা ইনারের বদলে আরও দুটি টি-শার্ট পরে বেরোলেন সাজেদুর। আর হাতমোজাগুলো ঝুলিয়ে রাখলেন মোটরসাইকেলের পেছনে, বাতাসে শুকানোর জন্য। রাহিমার মুখে নাকি তখন চওড়া একটা হাসি!

১৫ ডিসেম্বর ২০১৭: ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া

জম্মু ও কাশ্মীরের তাংমার্গ শহরের ছোট্ট একটা গ্রাম ফিরোজপুরা। ২০১৬ সালে কাশ্মীর গিয়েছিলেন সাজেদুর। সেবার ফেরার পথে ফিরোজপুরায় এক রাত ছিলেন এহসান নামের এক স্থানীয় লোকের বাসায়। এহসানদের ভালোবাসা আর আতিথেয়তায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে এবারও গিয়েছিলেন সেখানে। ডিসেম্বর, ভরপুর শীত। পুরো ফিরোজপুরাই ঢেকে ছিল শুভ্র তুষারের চাদরে। চোখ ধাঁধানো সাদা চাদরের মাঝে মাঝে বাহারি রঙের ঘরবাড়ি। আকাশটা ঝকঝকে নীল। এবারই প্রথম দেশের বাইরে ঘুরতে গিয়েছিলেন রাহিমা। ছবির মতো সুন্দর কাশ্মীর তাঁর চোখে লেগে আছে, ‘এই ভ্রমণে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে কাশ্মীর, মন কেড়ে নিয়েছে বলতে পারেন। সেখানকার মানুষগুলোও খুব আন্তরিক। এত ভালোবাসা পেয়েছি যে ভোলার নয়।’

কেবল কাশ্মীর নয়, সাজেদুর-রাহিমা দুজনই একবাক্যে স্বীকার করেছেন, ভারতের যেখানেই গেছেন, সেখানেই পেয়েছেন মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা। স্থানীয় বাইকারদের আন্তরিকতার নাকি তুলনা নেই। বিপদে এগিয়ে এসেছেন নির্দ্বিধায়, একাধিকবার।

১৬ ডিসেম্বর ২০১৭: আমার সোনার বাংলা
বিজয় দিবস কাশ্মীরেই পালন করলেন সাজেদুর-রাহিমা। মোটরসাইকেলে বাংলাদেশের পতাকাটা ছিল সব সময়ের জন্যই। বিজয় দিবসে চাইলেন পতাকাটা ওড়াবেন জম্মু ও কাশ্মীরের জোযি লা পর্বতের ওপরে। কিন্তু সোনেমার্গের ১০ কিলোমিটার আগে গগনগিরে সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট থেকে বলল, সামনে যাওয়া যাবে না, তুষারধসপ্রবণ এলাকা এটা। তার ওপর রাস্তায় এক-দেড় ফুট পুরু বরফ। কী আর করা, সাজেদুর সেনাবাহিনীর সদস্যদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখানে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে ছবি তোলা যাবে কি? আজকে আমাদের বিজয় দিবস।’ জবাবে জানাল, ‘ওড়ান, কোনো সমস্যা নেই।’ রাহিমা বলছিলেন, ‘মাতৃভূমির পতাকা অন্য দেশের মাটিতে ওড়ানোর যে কী আনন্দ, বুঝিয়ে বলা
খুব কঠিন!’

১৮ ডিসেম্বর ২০১৭: আমার এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ

চার দিন শ্রীনগরে থেকে দেশে ফেরার পালা। শ্রীনগরের রাস্তায় যানজট। সে ধকল সামালে সাজেদুর-রাহিমা নেমে পড়লেন পাহাড়ি রাস্তায়। কনকনে ঠান্ডা। আরও ধকল গেল সামনের একটা পেট্রলপাম্পে। তেল নিয়ে রাস্তায় ওঠার সময় ঠাস করে একটা শব্দ হলো। সাজেদুর বলছিলেন, ‘পেছন থেকে “বাইক থামাও! বাইক থামাও!” বলে চিৎকার করে উঠল রাহিমা। বাইক থামিয়ে নেমে দেখি, আমাদের ক্যারিয়ার ভেঙে গেছে! ক্যারিয়ারের সঙ্গে আমাদের মাথায় আকাশও ভেঙে পড়ল। জম্মু যেতে আরও ১৮০ কিলোমিটার বাকি।’

রাহিমা তখন প্রায় ১৭ কেজি ওজনের ব্যাগটা কাঁধে নিলেন। সেটা নিয়েই পাড়ি দিলেন প্রায় ৭৬০ কিলোমিটার পথ! ব্যথায় পিঠ টনটন করেছে, কোমর ধরে রাস্তায় বসে পড়েছেন, তারপরও দেশে ফিরেছেন হাসিমুখে। তরুণ এই দম্পতি বলছিলেন, ‘ভ্রমণের সময়টা আমাদের জীবনের সেরা সময় ছিল। জীবনকে নতুন করে দেখার জন্য মোটরসাইকেল–যাত্রার তুলনা হয় না। ইচ্ছা আছে, সময়–সুযোগ মিললে মোটরসাইকেলে চেপে ইউরোপে যাব আমরা।’

ভ্রমণ–পরামর্শ

নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে ভ্রমণের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পর্কে পরামর্শগুলো দিয়েছেন মো. সাজেদুর রহমান

ভ্রমণের প্রস্তুতি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে অনুমতি নিতে হয়েছে (অনুমতি নিতে কোনো টাকাপয়সার দরকার নেই)। কার্নে এবং ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিংয়ের অনুমতিপত্র নিতে হয়েছে অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ থেকে। কার্নের ফি ১২ হাজার টাকা। জামানত দিতে হয়েছে মোটরসাইকেলের দামের সমপরিমাণ টাকা। চালকের অনুমতিপত্রের জন্য দিতে হয়েছে আড়াই হাজার টাকা। এরপর ভিসা নিয়ে যেতে হয়েছে সীমান্তে। সেখানে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে ৩০০ টাকার নিরাপত্তা অঙ্গীকারপত্র জমা দেওয়ার পর বাকি দায়িত্ব তাঁদেরই। দেশ ছাড়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সীমান্তের একদম কাছে বাংলাদেশের একজন রাজস্ব কর্মকর্তার কাছে কার্নে দাখিল করতে হয়েছে। সেটার ওপর সাদা অংশে তাঁর সিলমোহর এবং সই বুঝে নিতে হয়। তারপরই ভারতে প্রবেশ।

প্রবেশ করেই কাস্টমস অফিসের সামনে মোটরসাইকেল কাস্টমস অফিসারের কাছে কার্নে পেশ করতে হয়। সেটা হয়ে গেলে ইমিগ্রেশন। খেয়াল রাখতে হবে, কার্নেতে যেন ভারতের কাস্টমস অফিসারের সিলমোহর এবং স্বাক্ষরও থাকে।

নিরাপত্তা পরামর্শ এবং নিয়মকানুন

নিরাপদে চলার সবচেয়ে উপযোগী সময় হলো দিনের বেলা। রাতে একান্তই কোনো প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় না নামাই ভালো। বিশেষ করে বিহারে রাতে না থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। ধাবা, রেস্তোরাঁ বা পেট্রলপাম্প ছাড়া হাইওয়েতে থামা যাবে না। সমস্যায় পড়লে ইমার্জেন্সি নম্বরে ফোন করুন। মোটরসাইকেল চালানোর সময় অবশ্যই নিজে এবং সঙ্গীর মাথায় যেন হেলমেট থাকে। ভারতের একেক প্রদেশের নিয়মকানুন একেক রকম। কোথাও গতিসীমা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার আবার কোথাও ১০০।

লম্বা ভ্রমণের শারীরিক প্রস্তুতি এবং অভিজ্ঞতা

সুঠাম দেহের অধিকারী হলেই যে শারীরিকভাবে আপনি যোগ্য, তা নয়। ধৈর্য এবং শারীরিক সক্ষমতাই আসল। লম্বা ভ্রমণের জন্য অনেক অভিজ্ঞতা দরকার। দিনে ৩০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার মোটরসাইকেল-যাত্রার অভিজ্ঞতা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

ভ্রমণের পরিকল্পনা

প্রথমে ঠিক করুন কোথায় যেতে চান, কখন যেতে চান। সে অনুযায়ী ভ্রমণ পরিকল্পনা ঠিক করুন। যাত্রাপথ, আবহাওয়া, থাকা-খাওয়ার খরচ, গন্তব্যস্থলে যেতে কোথায় কোথায় পেট্রলপাম্প, মেকানিক শপ আছে—এসব ঠিক করে নিন। স্মার্টফোনের গুগল ম্যাপে পিন পয়েন্ট করে রাখতে পারেন জায়গাগুলো।

Sending
User Review
0 (0 votes)

Add Comment