সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক তার বিচিত্র রূপের সমাহারে পর্যটকদের মুগ্ধ করেছে প্রজন্মান্তরে। প্রাসাদ, গুম্ফা, অর্কিড, কাঞ্চনজঙ্ঘার বাইরেও অনেক রূপের ঐশ্বর্য আছে তার ভাড়ারে। তেমনই এক মায়াবী তুষার পোশাকে সজ্জিত সিকিমের রানিকে ছুয়ে দেখেছেন লেখক। তাঁর বিরল অভিজ্ঞতার কথা পাওয়া যাবে এই লেখায়।

পাহাড়ের গায়ে বিস্তৃত গ্যাংটক শহর

কোনও দেশে বেড়াতে হলে নাকি যেমন দেশ তেমন সময়ে যেতে হয়। মানে গরমের দেশে গরমকালে আর শীতপ্রধান দেশে শীতকালে। তা হলেই নাকি সে দেশের আসল সৌন্দর্য উপলিব্ধ করা যায়। ভরা গরমে থর মরুভূমিতে বেড়াতে কেমন লাগবে জানি না, কিন্তু আমার বহু দিনের শখ শীতকালে কোনও পাহাড়ি জায়গায় গিয়ে বরফ দেখবার। অবশেষে গত শীতে সেই সুযোগ হল। ছোট্ট ট্যুরে গ্যাংটক যাওয়া িস্থর করলাম। অনেক দিন আগে এক বার গরমকালে গ্যাংটক বেড়াতে গিয়েছিলাম, তাই এ বার শুধু ঠাণ্ডা উপভোগ করতে যাওয়া। আর যদি ভাগ্যে থাকে তো বরফ দেখা।
েফ্রব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি এক ব্যাগ গরম জামা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। শিলিগুড়ি থেকে যে দিন রওনা দেব, হঠাৎ টিভির খবরে শুনলাম দার্জিলিংয়ে তুষারপাত হয়েছে। মনটা নেচে উঠল। দার্জিলিংয়ে যখন বরফ পড়েছে, গ্যাংটকেও কি আর হবে না? যদি না হয়? ভাবলাম গ্যাংটক না গিয়ে দার্জিলিং যাই। শেষমেশ মনে একুট দ্বিধা নিয়ে গ্যাংটকের উদ্দেশেই রওনা হলাম।

সারা রাস্তাই মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি পেলাম। বেলা ১২টায় যখন গ্যাংটকে নামলাম তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে, আকাশের মুখ ভার। বাস স্ট্যাণ্ডের পাশেই একটা হোটেল দেখে ঢুকে পড়লাম। দুপুরের খাওয়া সেরে বাজার ঘোরার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাদ সাধল বৃষ্টি। বিকেল থেকে শুরু হল ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি আর হিমেল হাওয়া। প্রচণ্ড শীতে প্রায় জবুথবু অবস্থা। হোটেলে ফিরে কম্বলের তলায় ঘরবিন্দ হয়ে রইলাম।

তবে আমরা তো আর ঘরবিন্দ হয়ে থাকতে যাইনি, গেছি বরফ দেখতে। তাই বিকেলের মধ্যে খবর নিয়ে জেনে নিলাম আশপাশে কোথায় কোথায় বরফ পড়েছে। গ্যাংটক থেকে ৩৮ কিলোমিটার দূরে ছাঙ্গু লেক, উচ্চতা ১২,৪০০ ফুট। ছাঙ্গু লেক সিকিমিদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। সেটিকে ঘিরে রয়েছে নানান জনশ্রুতিও। গ্রীষ্মকালে সেখানে ব্রাহ্মণী হাস ও বিভিন্ন পরিযায়ী পাখিদের দেখা যায়। এ ছাড়া প্রচুর ফুল তো আছেই। শুনলাম সেখানে প্রচুর বরফ পড়েছে। সারা শীতকাল লেকের জল জমে থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বরফ এত বেশি যে রাস্তা বন্ধ। মনটা খারাপ হয়ে গেল। এটা তো ভেবে দেখিনি। হোটেল থেকে বলল, পরদিন গ্যাংটকের আশপাশে ঘুরে পরের দিন ছাঙ্গু যাবার চেষ্টা করতে। আশা করা যায় তার মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানরা হয়তো রাস্তা থেকে বরফ সরিয়ে দিতে পারবেন।

রুমটেক গুম্ফা। ছবি: ইন্টারনেট

ঝলমলে আকাশ নিয়ে পরদিন সকাল হল। আমরাও দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম। সিকিম বৌদ্ধ গুম্ফার দেশ। রাজ্যে প্রায় ২৫০টি গুম্ফা আছে, তবে রুমটেক গুম্ফাটি অবশ্যদ্রষ্টব্য। ২৪ কিলোমিটার সুন্দর পাহাড়ি পথ ১ ঘণ্টায় পৌছে গেলাম। প্রধান ফটকের বাইরে গাড়ি থেকে নেমে বাকি ১কিলোমিটার রাস্তা হেটেই যেতে হয়। কিছুটা এগোতে কানে ভেসে এল ড্রাম বাজানোর গম্ভীর আওয়াজ। ভিতরে পৌছে দেখলাম গুম্ফার উঠোনে ধীরে ধীরে লামারা জড়ো হচ্ছেন। লামাদের চিরপরিচিত পোশাকের সঙ্গে একটা রংচংয়ে চৌকো ব্যাগের মতো জিনিস সামনে ঝোলানো আর পায়ে সাদা জুতো ছিল। পুরো উঠোনে ঘিরে সারিবদ্ধ হয়ে দাড়িয়ে বাজনার তালে তালে একসঙ্গে তারা নাচ শুরু করলেন। বিভিন্ন বয়সের লামারা একই ভঙ্গিমায় ঘুরে ঘুরে নেচে চললেন। বেশ কিছুক্ষণ দাড়িয়ে এই অদ্ভুত নাচ দেখলাম। জিজ্ঞেস করে জানলাম এটা নাকি প্রার্থনানৃত্য, বছরে দু’বার হয়। প্রার্থনানৃত্য মানে এটা নিশ্চয় কোনও প্রাচীন কলা, যা যুগযুগ ধরে লামারা পরিবেশন করে চলেছেন। অজােন্তই একটা বিশিষ্ট জিনিস দেখবার সৌভাগ্য হল। ড্রাম আর করতালের গম্ভীর নাদ আর লামাদের নৃত্য, সব মিলিয়ে সেখানে একটা গুরুগম্ভীর বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছিল। শুধু আমাদের মতো দেশি বিদেশি পর্যটকের উপিস্থতি হয়তো সেই গাম্ভীর্য কিছুটা লাঘব করেছিল। একটা ব্যাপার আমার দৃষ্টি আর্কষণ করল। লামাদের এই নাচের ছবি তো আমরা তুলছিলাম, বা বিদেশিরা ভিডিও ক্যামেরায় তুলছিলেন। কিন্তু এক জন লামাও সেটি ভিডিওবিন্দ করছিলেন। অত্যাধুনিকতার ছোয়া থেকে এই প্রাচীন সম্প্রদায়ও বাদ যায়নি দেখে খুশি হব, অবাক হব, না দুঃখিত হব, ভেবে পেলাম না।

রুমটেক ধর্মচক্র কেন্দ্র, তিব্বতি বৌদ্ধদের কাগয়ু সম্প্রদায়ের শিক্ষাকেন্দ্র। সেখানে পৃথিবীর কদাচ দৃষ্ট ও দুষ্প্রাপ্য ধর্মীয় পুথির সম্ভার আছে। ১৭৩০ সালে নবম কারমাপা প্রথম রুমটেকে একটি গুম্ফা নির্মাণ করান। কিন্তু পরবর্তী কালে সেটি অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়ে যায়। পরে ১৯৬০ সাল নাগাদ ষোড়শ কারমাপা সেটি আধুনিক রূপে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। রুমটেকের চার দিক সুলক্ষণ ও শ্রীমণ্ডিত। পিছনে পাহাড়, সামনে তুষারশৃঙ্গ, ঝরনা আর নীচে নদী। তা ছাড়া জায়গাটি রাজধানী গ্যাংটক থেকে ঘন্টাখানেকের পথ। ষোড়শ কারমাপা তাই এই জায়গাটিই গুম্ফা নির্মাণের জন্য শুভ মনে করেন।

লামারা বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন।

বর্তমানে রুমটেক সিকিম তথা উত্তরপূর্ব ভারতের বৃহত্তম গুম্ফা। সিকিমের চোগিয়াল রাজবংশ বরাবরই কারমাপা পরম্পরার সমর্থক হিসেবে তাদের সাহায্য করেছেন। রুমটেক গুম্ফাটি তিব্বতের কাগয়ুরপা গুম্ফার আদলে নির্মিত। তিব্বতের বাইরে এখানেই কাগয়ু সম্প্রদায়ের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এই সম্প্রদায়ের ৮০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য এরাই বজায় রেখেছেন। এখানে একটি অতি অপূর্ব স্বর্ণস্তূপে ষোড়শ কারমাপার স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত আছে। এ ছাড়াও আছে প্রার্থনাগৃহ, লামাদের বাসস্থান ও বৌদ্ধশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্ম শ্রী নালন্দা ইনিস্টটিউট নামে কলেজ। চোগিয়াল রাজবংশ ছাড়াও ভারত সরকার তথা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এই গুম্ফা নির্মাণে সহায়ক হন।

গুম্ফার ভেতরে অবশ্য সব জায়গায় জনসাধারণের যাওয়ার অনুমতি নেই। তবে প্রার্থনাগৃহটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সেখানে আমরা বিরাট বুদ্ধমূর্তি দেখলাম। প্রধান বুদ্ধমূর্তির পাশে রয়েছে হাজারটা ছোট ছোট বুদ্ধমূর্তি, বুদ্ধের হাজার আবির্ভাব মনে করিয়ে দিতে। ঘরের চার দিকে রয়েছে বোধিসত্ত্বর বিভিন্ন প্রতিকৃতি। ঘরটি প্রায় অন্ধকার। শুধু প্রার্থনার জ্যোতিস্বরূপ জ্বলছিল অনেক মাখনের প্রদীপ। মাখনের প্রদীপ জ্বালানো বৌদ্ধদের উপাসনার একটি অঙ্গ। প্রার্থনাগৃহের মধ্যে সারি দিয়ে লাল আসন পাতা। প্রার্থনার সময় লামাদের বসার জায়গা। মন্দিরগৃহ চার দিকের স্তম্ভ থেকে ঝোলানো তাঙ্খা আর ঝালর দিয়ে সজ্জিত। এই প্রার্থনাগৃহটি আমরা অবশ্য প্রদক্ষিণ করলাম। বৌদ্ধ মতে তাতে পুণ্য অর্জন হয়।

রুমটেকের দেওয়াল চিত্র

প্রার্থনাগৃহে প্রবেশ করতে হয় যে বারান্দা দিয়ে, তার দেওয়ালে নানান চিত্র আকা। চিরাচরিত তিব্বতি ঢঙে লাল, হলুদ, সবুজ রঙের প্রাধান্যে উজ্জ্বল ছবি সেখানে অঙ্কিত। ছবিগুলি তিব্বতি মতে মহাবিেশ্বর চার রক্ষকের প্রতিছবি। প্রবেশদ্বারের ঠিক উপরে কয়েকটা মুখোশ টাঙানো। গুম্ফার বাইরের উঠোনের মাঝখানে একটা স্তম্ভ আছে। সেই স্তেম্ভর গায়ে তিব্বতি ভাষায় রুমটেকের ইতিহাস খদিত আছে।

ফিরতি পথে গেলাম সিকিমের জওহরলাল নেহেরু বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখতে। এটি শতাধিক রকমের ফুল আর অর্কিডের বিখ্যাত বাগান। শীতকাল, তাই ফুলের মরশুম নয়। অাগে এক বার গরমকালে বেড়াতে গিয়ে ফুলে ভরা সেই বাগান দেখেছিলাম। তখন ছিল বর্ণময়, এখন বিবর্ণ।

গুম্ফা হল, বাগান হল, কিন্তু বরফ কই? রাস্তায় এক জায়গায় চালক আমাদের দেখালেন উেল্টা দিকের দূরের পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা ছাঙ্গু লেক। আমি আবার উৎসাহিত হয়ে উঠলাম। আর যদি বৃষ্টি না হয়, রাস্তা যদি পরিষ্কার হয়ে যায় তা হলে হয়তো পরদিনই ওই তুষাররাজ্যে পৌছে যাব। তবে তার আগেই বরফ পড়ার একটা প্রাথমিক আভাস সে দিন বিকেলেই পেলাম। বিকেলে গেলাম হনুমানটক। সেখানে হনুমান মন্দির আছে। তবে উদ্দেশ্য মন্দির দেখা নয়। গাড়ির চালক আমাদের বলেছিলেন আগের রাতে সেখানে বরফ পড়েছিল, আবার বিকেলে পড়তে পারে। কিছুটা পথ যেতেই চোখে পড়ল রাস্তার ধারে ধারে বরফ জমে আছে। বহু বার নানান পাহাড়ি জায়গায় বেড়াতে যাবার সুবাদে ও রকম জমে থাকা বরফ আমি আগেও দেখেছি। তবে আরও দুটো বাক এগিয়ে দেখলাম, না, রাস্তার দু’পাশ, গাছের মাথা, বরফে সাদা হয়ে আছে। তুষাররাজ্য না হলেও বরফ আছে। হনুমানটক পৌছে দেখলাম কয়েক জন পর্যটক বরফের উপর খেলা করছেন। নেমে পড়লাম তাদের দলে যোগ দিতে। হঠাৎই গায়ে যেন দু’ফোটা জল পড়ল। পরিষ্কার আকাশ, সূর্য অস্তাচলে, কিন্তু তখনও শেষ আভা আকাশ আলো করে রেখেছে। বৃষ্টি নয়। তবে কি বরফ? ভাবতে ভাবতে দেখলাম পেজা তুলোর মতো সাদা হয়ে গায়ে বরফ পড়ছে। উফ্‌ কী খুশি যে হলাম! মনটা নেচে উঠল। যাক, তা হলে শীতকালে শীতের দেশে বেড়াতে আসা সার্থক হল। তবে ভ্রমণপিপাসুর মন তো, কিছুতেই ভরে না। বরফ তো হল, অনেক অনেক বরফ কই? বরফের গোলা বানিয়ে ছোড়াছুড়ি করব, তেমন বরফ সেখানে ছিল না। দু’-চার মিনিটে বরফ পড়াও বন্ধ হয়ে গেল। হোটেলে ফিরেই ছাঙ্গু যাবার খবর নিলাম। শোনা গেল সে দিন দুটো গাড়ি গেছে, হয়তো পরদিন সব গাড়িই যাবে। সাতপাচ না ভেবে সকালেই গাড়ির ব্যবস্থা করে ফেললাম। হোটেল থেকে বলে দিল, সকাল সকাল বেরোতে হবে, ফিরতে হবে বিকেলের মধ্যে।

সকালে প্রাতরাশ সেরে ভারী গরম জামা, কোট, টুপি, গ্লাভস নিয়ে তৈরি হয়ে গাড়িতে চেপে বসলাম। গাড়ি গ্যাংটক ছাড়িয়ে উত্তরের দিকে চলল। ধীরে ধীরে অনুভব করলাম হিমেল হাওয়া যেন আরও কনকনে হয়ে উঠেছে। গাড়িতে যে বাকি সহযাত্রী ছিলেন, খেয়াল করলাম কেউ-ই আমাদের মতো আপাদমস্তক মুড়ে গরমজামা পরেননি। নিজেদের একটু শীতকাতুরে বাঙালি ভেবে লজ্জিতই হলাম। গাড়ি বেশ আেস্ত আেস্তই যাচ্ছিল। আমি বাইরের দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। পাহাড় দেখলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় একই রকম। সেই পাকদণ্ডির পথ, একদিকে খাদ, পাইনবন। কিন্তু তাও সব পাহাড়ের চরিত্রই আলাদা আলাদা হয়। দেখলেই মনে হয় এ স্বতন্ত্র, আর কোথাও নেই। তবে এ বার আমি মনঃক্ষুণ্ণই হচ্ছিলাম। গত সাত দিন ধরে যেখানে বরফ পড়ে রাস্তা বন্ধ, সেখান থেকে কি রাতারাতি বরফ উধাও? আমি তো ভাবছিলাম, চলেছি তুষাররাজ্যে, চার দিক বরফে সাদা হয়ে থাকবে, এ তো দেখি সবুজ বন!

চারপাশ বরফে মুড়ে আছে।

খানিক দূর এই ভাবে যাবার পর গাড়ির চালক বললেন, রাস্তার পাশে বরফ। দূর! এ তো আগের দিনও দেখেছিলাম। জানলার কাচে নাক ঠেকিয়ে বসে রইলাম, মনে একরাশ দুঃখ নিয়ে। হঠাৎ দেখে মনে হল বাইরেটা আবছা হয়ে গেছে। বোধহয় গাছের ছায়া। সোজা হয়ে বসে ভাল করে বাইরে তাকালাম। শিরদাড়ায় শিহরন খেলে গেল। বরফ, বরফ, অনেক বরফ। আনেন্দ আত্মহারা হয়ে জানলার কাচ নামিয়ে মুখ বার করলাম। দমকা হাওয়া এসে নাক, চোখ, মুখ জমিয়ে দিল। চার দিকে বরফ, শুধু বরফ। আরও কিছু দূর এগিয়ে গাড়ি দাড়িয়ে পড়ল। দেখলাম আরও গাড়ি দাড়িয়ে। চালক জানালেন সামনে আর গাড়ি যাচ্ছে না, পথ আটকে, প্রচুর বরফ, রাস্তা বন্ধ। ছাঙ্গু তখনও প্রায় ১৫-১৬ কিলোমিটার। সময় নষ্ট না করে হুড়মুড় করে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। চার দিক বেশ অন্ধকার, যেন সন্ধ্যা হয় হয়। সেই সঙ্গে হাড় হিম করা ঠাণ্ডা। ভাগ্যিস পর্যাপ্ত পোশাক ছিল! সহযাত্রীরা অনেকেই গাড়ি থেকে নামবার সাহস করতে পারলেন না।

এই বার চারপাশ দেখে মনে হল, হ্যা, তুষাররাজ্যে এসেছি। যত দূর চোখ যায় বরফে মুড়ে আছে। মেঘে ঢেকে আছে সব কিছু। আরোপিত প্রভাব অনেকটা সাদাকালো ছবির মতো। ছাঙ্গু পৌছতে পারি না পারি, বরফ তো ঘাটি, বলে আমিও বরফের উপর পড়লাম এক লাফে। দুহাত দিয়ে বরফ জড়ো করে তুষারমানুষ বানাতে জুটে গেলাম। সব গাড়িই সেখানে থেমে। সামনে খাড়াই রাস্তা বরফে ঢাকা। তাই কোন চালকই আর ঝুকি নিতে রাজি হলেন না। কী আর করা যাবে! শীতে জমে থাকা ছাঙ্গু লেক আর দেখা হল না। সেখানে পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য ইয়াকের পিঠে চেপে বেড়ানোর ব্যবস্থা আছে। তাও করা হল না। মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিলাম যে, বরফ দেখতে গিয়েছিলাম, বরফ পেয়েছি, আর কী চাই? এক মনে বরফ ঘাটছি, গোলা বানিয়ে ছোড়াছুড়ি করছি, মনে হল যেন চার দিক আরও আবছা হয়ে উঠল। খেয়াল করলাম বরফ পড়ছে। আগের দিন বিকেলের হাল্‌কা পেজা তুলোর মতো ভাসা ভাসা বরফ নয়। বেশ ঘন সাদা হয়ে তুষারপাত হচ্ছে। নিমেষে যেন দিিগ্বদিক সাদা আস্তরণে ঢাকা পড়ে গেল। নিজেদের নিশ্বাস চোখের সামনে গাঢ় হয়ে উঠতে থাকল, সঙ্গে ঠাণ্ডার কনকনানিও বেড়ে গেল। যারা নেমেছিলেন তাদের অনেকেই গাড়ির মধ্যে উঠে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর রাস্তা কাপিয়ে সেনাবাহিনীর ট্রাক এল। বরফ কাটতে কাটতে রাস্তা পরিষ্কার করে সীমােন্তর দিকে চলে গেল। ছাঙ্গু ছাড়িয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে নাথু লা পাস পেরিয়ে ভারত-চিন সীমান্ত। পুরো এলাকাই বরফে ঢাকা। সতর্কবাতা অনুযায়ী সেনাবাহিনী ছাড়া ওই পথে সাধারণ নাগরিকের আনাগোনা নিরাপদ নয়। তাই সব গাড়ি ওখানেই থেমে রইল। আর পর্যটকরা, বেশির ভাগই বাঙালি, সেখানে হুটোপাটি, হৈ-হট্টগোল করে বরফে খেলতে লাগল। ভরা শীতে বরফে ঢাকা পাহাড়ের মৌন পরিবেশ বাঙালি সমাগমে মুখর হয়ে উঠল। লোকের ভিড়ে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা কোথায় হারিয়ে গেল।

পান্না-সবুজ আরিটার লেক

অতি সাবধানে বরফের ওপর হেঁটে দুটো বাক ছাড়িয়ে উঠে গেলাম। সেখানে গোলমাল অনেক কম। শান্ত, ধূসর, আলো আধারি মাখা নৈসর্গিক এক অপরূপ সৌন্দর্যের রূপরেখা চোখের সামনে ফুটে উঠল। আগে কখনও এরকম অনবদ্য দৃশ্য দেখিনি। সেই দৃশ্য শুধু চোখ দিয়ে দেখলে যথেষ্ট হয় না, তাকে অনুভব করতে হয়। কোথাও কিছু নেই, শুধু বরফ, যেন আদিম যুগের সম্পূর্ণ নির্জন এক প্রান্তর। শো শো করে বইছে ঠাণ্ডা হাওয়া। মনে হল প্রকৃতি যেন এক আনকোরা রূপে ধরা দিতে এসেছে। ধীরে ধীরে বরফ পড়া বাড়তে থাকল। নীচে নেমে এলাম। গাড়ি চালকরা আর বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে সাহস করল না। আমরা গ্যাংটক অভিমুখে রওনা দিলাম।

সিকিম ভারতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে অবিস্থত এই ছোট রাজ্যে বাসিন্দা প্রধানত নেপালি, লেপচা ও ভুটিয়া মিলিয়ে। চতুর্দশ শতাব্দীতে ভুটিয়ারা এসেছিলেন তিব্বতের খাম জেলা থেকে। এরা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। পরে আসে লেপচারা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে আসেন হিন্দু নেপালিরা। তবে আজকাল পর্যটক কেন্দ্র হয়ে ওঠার সুবাদে ভারতের প্রায় সব প্রােন্তর মানুষই সিকিমে বসবাস করছেন। রাজ্যের প্রচলিত ভাষা নেপালি। সঙ্গে ব্যবহার হয় ভুটিয়া, জঙ্ঘা, লেপচা, গ্রুমা, গুরুং, সিকিমি, তিব্বতি, য়াখা প্রভৃতি নানান স্থানীয় ভাষা।। তবে ইংরাজি ও হিন্দির প্রচলনও অবশ্যই আছে। সিকিমে যেহেতু জনসংখ্যার হিসেবে নেপালিদের বাস সব থেকে বেশি, তাই বৌদ্ধ গুম্ফার দেশ হলেও, সিকিমের জনগণ মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছাড়াও আছেন সংখ্যালঘু খ্রিস্টানরা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ মিশনারিরা প্রধানত লেপচা সম্প্রদায়ের মানুষদের ধর্মান্তরিত করেছিলেন।

সিকিম একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। দেশি বিদেশি সব পর্যটককেই সে আকৃষ্ট করে তার অতুল সৌন্দর্যের সম্ভার নিয়ে। রাজ্যটিও বেশ সুন্দর ভাবে সংরক্ষিত। ঘুরেফিরে বেড়াবার পথে টুকিটাকি খবর নিচ্ছিলাম স্থানীয়দের থেকে। রাজ্যে কোনও জলকষ্ট নেই, যা পাহাড়ি জায়গায় সচরাচর দেখা যায়। সিকিমে জল পরিশোধন করে যেখান থেকে সরবরাহ হয়, সেই জায়গাটি পাহাড়ের ওপর থেকে দেখলে মনে হয় যেন গোলাকার ফোয়ারায় সুসজ্জিত একটি পার্ক। আমাদের গাড়ির চালকই আমাদের গাইড হয়ে সব দেখাচ্ছিলেন। তার কাছ থেকেই জানলাম, পাহাড়ের উপর যেখানে সারা বছর বরফ জমে থাকে, সেখান থেকে তা গলিয়ে জলের জোগান হয়। বরফ গলা জল কয়েক স্তরে পরিশোধন করে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয়। বরফের জোগান যেহেতু সারা বছর, জলের জোগানও তাই পর্যাপ্ত।

জল পরিশোধনাগার।

চেনা অচেনা সিকিম অভিযানের জন্য কিন্তু দু’-চার দিন যথেষ্ট নয়। সিকিম ছোট হলেও বেড়াবার জায়গা অনেক। পূর্ব সিকিমে অবিস্থত রাজধানী গ্যাংটকই রাজ্যের অন্যতম প্রবেশদ্বার। উত্তর দক্ষিণ বা পশ্চিম সিকিম বেড়াতে চাইলে আলাদা আলাদা করেই যেতে হয়। আজকাল ভারত-চিন বাণিজ্যের জন্য নাথু লা পাস খুলে দেওয়া হয়েছে। জনসাধারণেরও সেই পর্যন্ত যাবার অনুমতি আছে, তবে পর্যটন বিভাগ থেকে পারমিট করাতে হয়। এটির সুবিধা শুধুমাত্র ভারতের নাগরিকদের জন্যই প্রযোজ্য। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এমনিতে সারা রাজ্য থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতশৃঙ্গ দেখতে পাওয়া যায়। তবে তাসি ভিউ পয়েন্ট থেকে খুব সুন্দর কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন করা যায়। সব মিলিয়ে এই ক্ষুদ্র রাজ্য তার অশেষ সৌন্দর্যের সম্ভার নিয়ে পর্যটক মনকে বারংবার আকৃষ্ট করে চলেছে।

ঊর্ণা মুখোপাধ্যায়
সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ জুলাই ২০০৮