ফলের রাজ্যে কিছুক্ষণ

একসঙ্গে তিন তিনটা বাগান দেখা যাবে—বন্ধুর কাছ থেকে জানার পর মনটা উড়ে যাচ্ছিল ওখানে। কখন, কবে যাওয়া যাবে। জায়গাটা হলো হবিগঞ্জ শহরের শাহজীবাজার গ্যাসক্ষেত্র, শাহজীবাজার ফ্রুটস ভ্যালি ও শাহজীবাজার রাবার বাগান।
সময় ও সুযোগ বুঝে একদিন নিজেদের গাড়িতে করে রওনা হলাম। সঙ্গে সেই বন্ধু, রাবার বাগানেরই কর্মকর্তা। উনিই আমাদের গাইড।
ঢাকা পেরিয়ে পূবাইলে গাড়ি ঢুকতেই রাস্তার দুই পাশে সারি সারি সবজি বাগান দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। কোনো বাগানে করলা, কোনো বাগানে শসা, বেগুন, চিচিঙা, লাউ, বরবটি লম্বা হয়ে ঝুলে আছে। কৃষক তৃপ্তমুখে বেছে বেছে তুলে দিচ্ছেন পাইকারদের হাতে। পাশেই ট্রাকের সারি। ঢাকায় নিয়ে আসার অপেক্ষায়। বাংলার কৃষকের এই অপরিসীম আনন্দ দেখতে দেখতে আমরা পুবাইল, নরসিংদী, ভৈরব সেতু পেরিয়ে একটু এগিয়েই পেলাম ‘উজান-ভাটি রেস্টুরেন্ট’। এখানে হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ে আবার যাত্রা শুরু হলো। মাধবপুর উপজেলা পেরিয়ে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই চলে এলাম শাহজীবাজার গ্যাসক্ষেত্রে। এখানে আটকে দিলেন নিরাপত্তারক্ষীরা। ফ্রুটস ভ্যালি দেখব বলতেই অবশ্য ছেড়ে দিলেন আমাদের। গ্যাসক্ষেত্রে মোটা মোটা পাইপ আর অনেক উঁচু একটা টিলার ওপর সুন্দর সাজানো-গোছানো অফিসঘরে কিছু পুরোনো গাছ ছাড়া তেমন কিছুই নেই। তাই আমরা এলাম এই ফিল্ড-লাগোয়া অসাধারণ এক ফলের বাগান শাহজীবাজার ফ্রুটস ভ্যালিতে। অভ্যর্থনা জানালেন এই বাগানে কর্মরত এ টি এম নাছিমুজ্জামান।
অনেক উঁচু এক পাহাড়ের ওপর এই বাগান। চমত্কার কারুকাজময় সিঁড়ি বেয়ে যতই ওপরে উঠছি, মনে হলো ফলের গাছে ঘেরা কোনো বাড়িতে যেন প্রবেশ করছি। দেশি-বিদেশি ফলের ভারে গাছগুলো নুয়ে আছে। যেদিকে তাকাই, চোখ আটকে যাচ্ছে। নাছিম সাহেব ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন গাছের কোথায় কার জন্ম, কোথা থেকে আনা হয়েছে, কীভাবে যত্ন নিতে হবে—সব বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। শুধু দেখানো নয়, একটু পর আমাদের খাওয়ার জন্য দিলেন লাল টকটকে জামরুল।
মুখে দিয়ে মনে হলো, কোনো স্বর্গীয় ফল খাচ্ছি। এই বাগানে আছে প্রায় ১৮২ রকম ফলদ, ঔষধি ও মসলাজাতীয় গাছ। আরও আছে বিরল প্রজাতির কিছু খরগোশ, কথা বলা ময়না, তুর্কি মোরগ-মুরগি, সাদা ও সবুজ ঘুঘু। এ ছাড়া বিশাল এক হাউসে আছে মনোমুগ্ধকর বর্ণিল সব মাছের জলকেলি। এখানে যত দেশি-বিদেশি পর্যটক এসেছে, সবাই একটা করে গাছ লাগিয়ে নিজেদের নাম সারা জীবনের জন্য অক্ষতভাবে লিখে গেছে। বিদেশি কয়েকজন রাষ্ট্রদূতও রয়েছেন এই তালিকায়।
এই বাগানের পাশেই অনেক উঁচু এক পাহাড়ের ওপর আছে সুন্দর একটি রেস্টহাউস। এখানে বসার ঘরের জানালা খুললেই দেখা যাবে অসাধারণ এক কৃত্রিম ঝরনা। ঝরনার পানির কলকল শব্দ ভরিয়ে দেবে আপনার দেহ-মন। ঝরনার ওপর তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম কিছু বলাকার সারি। হঠাত্ তাকালেই মনে হবে, নিশ্চিন্তে বসে বলাকারা মাছ শিকার করছে।
এ ছাড়া তৈরি করা হয়েছে ট্রেনের কামরায় কিছু বিশ্রামাগার। বাগানে কাজের পর কর্মকর্তারা এখানে এসে বিশ্রাম নেন। ভেতরে ঢুকে মনে হলো, আমরা যেন এস্কিমোদের বরফঘর ইগলুতে প্রবেশ করেছি। বেরোতে ইচ্ছা না করলেও একসময় বেরিয়ে আসতে হলো। ক্যামেরা সচল থাকতে থাকতেই আমরা চলে এলাম শাহজীবাজার রাবার বাগানে। উঁচু-নিচু পাহাড়ের গা বেয়ে সারি সারি রাবারগাছ আকাশের দিকে উঠে গেছে। গাছের নিচের অংশে খেজুরগাছের মতো বাটি বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাঁঠালের কষের মতো এই কষ যন্ত্রের মধ্যে দিলে বেরিয়ে আসে গজ কাপরের মতো বড় বড় রাবার শিট। নানা রকম শিল্পে ব্যবহূত হয় তা।
ফিরতি পথে আমরা কিছুটা ক্লান্ত। তবু মনকে আক্রান্ত করতে পারেনি সেই ক্লান্তি। চমত্কার এক জায়গা দেখার অনুভূতি নিয়ে কীভাবে যাবেন। বেশ সতেজ মনেই বেরিয়ে এলাম আমরা। ঢাকা থেকে বেশি দূরে নয়; সায়েদাবাদ থেকে বাসে সকালের দিকে রওনা হলে দুপুরের অনেক আগেই পৌঁছানো যাবে। পুবাইল, নরসিংদী, ভৈরব ব্রিজ পেরিয়ে উজান ভাটি রেস্টুরেন্টে বিশ্রাম নিয়ে মাধবপুর পেরোলেই পৌঁছানো যাবে শাহজীবাজার ফ্রুটস ভ্যালি ও শাহজীবাজার রাবার বাগান। আর নিজেদের গাড়ি থাকলে তো কথাই নেই। পরিবারের সবাই মিলে আনন্দ করে দেখে আসা যাবে আকর্ষণীয় এই বাগান।

জিনাত নাজিয়া
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, অক্টোবর ২৭, ২০০৯

Sending
User Review
0 (0 votes)

Add Comment