বিশ্বের সুন্দর ও আধুনিক নগরীগুলোর মধ্যে অন্যতম ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস। ইউনেস্কোর সদর দফতর প্যারিসে অবস্থিত। সম্প্রতি ইউনেস্কোর আমন্ত্রণে আমাকে প্যারিসে যেতে হয়েছিল। বাংলাদেশের জন্য আনন্দের সংবাদ ছিল এই যে, ইউনেস্কো’র এবারকার অধিবেশনে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৪৩ ভোট পেয়ে বাংলাদেশ আগামী ৪ বছরের জন্য ইউনেস্কো’র নির্বাহী বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রী জনাব নূরুল ইসলাম নাহিদ ইউনেস্কোর ৩৫তম এবারকার সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতা ছিলেন।

প্যারিস নগরী সত্যিই অপূর্ব। জুড়ি এর মেলা ভার। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, যেন পটে আঁকা একটি শহর। আলোয় আলোকিত ব্যস্ত নগরী প্যারিসে স্বল্প সময়ের জন্য বেড়াতে এসে মন ভরে না কোনো পর্যটকের। শুধু প্যারিসে কেন গোটা ফ্যান্সে দেখা এবং জানার মত নিদর্শনের শেষ নেই। প্যারিস নগরীতে ঘুরে বেড়ানোর স্থান বহু। আইফেল টাওয়ার, প্যারিস গেট, প্রেসিডেন্টের বাস ভবন এলিজী প্যালেস, এনভারস্‌ এ মোমার্থ পার্লামেন্ট হাউজ লুক, যাদুঘর, নটরডেম গীর্জা, কর্নকড টাওয়ার, গীমে যাদুঘর, নেপালিয়ানস্‌ টুম ইত্যাদি না দেখলে প্যারিস সফর অর্থহীন হয়ে যায় যেন। আইফেল টাওয়ারে না উঠে সম্পূর্ণ প্যারিস শহরটাকে অতি সহজে দেখা সম্ভব নয়। তাই আইফেল টাওয়ারে উঠা চাই। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইউরোপের দর্শনীয় শহরগুলোর মধ্যে প্যারিস অন্যতম। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার মধ্য যুগে সপ্তম আশ্চর্যের একটি । এখনও প্যারিসের প্রধান শোভা আইফেল টাওয়ার। ১৮৮৯ সালে মি. গুসটাভ আইফেল টাওয়ার স্থাপন বা নির্মাণ করেন। পুরো টাওয়ারটা তৈরী করতে লোহা বা স্টিলের মোট মেটাল পার্টস বা যন্ত্রাংশ ছিল ১৮ হাজার ৩৮টি। আইফেল টাওয়ারটি চারটি বিশাল লোহার পিলারের ওপর দাঁড়ানো। প্রায় ২৫০ জন নির্মাণ কর্মী বা শ্রমিক ২ বছর ৫ মাস যাবৎ বিরামহীনভাবে নির্মাণ কাজ শেষ করতে পেরেছিলেন। রাতে আইফেল টাওয়ারে কয়েক লাখ রঙ্গীন বাতি বার বার তার রং বদলাচ্ছে। পুরো টাওয়ারের গায়ে লক্ষ লক্ষ বাতি জ্বলছে। এ দৃশ্য রাতের বেলায় দেখতে কি যে অপূর্ব লাগে তা নিজের চোখে না দেখলে বুঝানো বড়ই দুরূহ। দূর থেকে আইফেল টাওয়ার দেখতে খুব সরু মনে হলেও আসলে কিন্তু তা অনেক প্রশস্ত ও বিশাল। একই সঙ্গে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার দর্শনার্থী আইফেল টাওয়ারে উঠতে পারে। প্রতি বছরই আইফেল টাওয়ারে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন দর্শনার্থীর আগমন ঘটে থাকে। আইফেল টাওয়ারের উচ্চতা ১০৮১ ফুট ৭ ইঞ্চি এবং এর ওজন ১০ হাজার ১০০ মেট্রিক টন। ভ্রমণ বা দেখার জন্য সিঁড়ি বা লিফটের সাহায্যে টাওয়ারটির শীর্ষস্থানে ওঠা যায়। সেখানে থেকে প্যারিস নগরীর সৌন্দর্য চমৎকারভাবে উপভোগ করা এবং প্রায় ৭৫ কিলোমিটার পর্যন্ত শহরটি দেখা যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন ব্যস্ততম নগরীর মধ্যে প্যারিস অন্যতম হলেও মাটির নিচে মেট্রো থাকার কারণে রাস্তায় তেমন যানজট না থাকলেও গাড়ী পার্কিং-এর সংকটে গাড়ীর মালিকদের পুলিশের ভয়ে তটস্থ থাকতে দেখা যায়। তবে প্যারিস শহরের পুলিশের ব্যবহার চমৎকার।

রাজধানী প্যারিসের রাস্তায় রাস্তায় হোটেল, রেষ্টুরেন্ট, বার, নাইট ক্লাব ইত্যাদি ভরপুর। নগরীর লোকজন ব্যস্ততার জন্য ঘর থেকে বাইরে বা রেষ্টুরেন্টে খেতে বেশি পছন্দ করে। বন্ধের দিন শনি ও রবিবার বাসায় বেশ ধুমধাম বা পার্টির আয়োজন করে। চেনা-জানা না থাকলে প্যারিস নগরীতে ম্যাপ নিয়ে চলাফেরা করা অতি সহজ। তবে নতুন হলে কোন বাংলাদেশী পরিচিত কাউকে নিয়ে প্যারিস শহর ঘুড়ে বেড়ানো আনন্দময় এবং সহজ হবে। ফ্রান্সে কোন চুরি ডাকাতি রাহাজানি ছিনতাই এর কোন চিহ্ন নেই।

প্রায় সাড়ে ৬ কোটির জনসংখ্যা অধ্যুষিত ফ্রান্সের রাজধানীতে মাত্র ১০ লক্ষ লোকের বসবাস। প্যারিস শহর স্বল্প অর্থে ঘুরে বেড়ানোর জন্য আরিয়ার (ট্রেন) মেট্রো’র সুব্যবস্থা রয়েছে। সাড়া ফ্রান্সে প্রায় এক হাজার মসজিদ খুঁজে পাওয়া যাবে। প্যারিস শহরটা চমৎকার এবং মনে হয় ছবির মত সাজানো গোছানো। শৃংখলা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এই ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে সহজে কেউ আইন ভঙ্গ করে না। দেশটিতে মরক্কো, আলজেরিয়া, আফ্রিকা ইত্যাদি দেশের লোক আছেন অনেক। এখন ভারতীয়, পাকিস্তানী ও বাংলাদেশী লোকের সংখ্যাও একেবারে নগণ্য নয়।

ফরাসীরা ফুল ভালবাসে বলে আপনজনের বিয়ে, জন্ম ও মৃত্যুতে ফুল উপহার দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে থাকে। প্যারিসে প্রতিদিন প্রচুর ফুল বেচাকেনা হয়ে থাকে। তারপরও ফ্রান্সের পারফিউম বিশ্ববিখ্যাত।

মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, অক্টোবর ২৮, ২০০৯