পৃথিবীর শেষ প্রান্তে একদিন

তুষারকন্যা, অপচ্ছায়া, হারকিউলিস-এসব আমার কুকুরের নাম। এমন ছয়টি নাম একটি কাগজে লিখে আমার হাতে দিয়ে রবার্ট বলল, ‘তুমি যেহেতু এককালে কুকুর পুষতে, তোমাকে আমার বেশি ব্যাখ্যা করতে হবে না। এই যে নাম দেখছ, এ ছয় কুকুর এখন তোমার। এরা শক্তিশালী, কর্মঠ, ভদ্র জানোয়ার। হাঁকডাক দেখে ভয় খেয়ো না। আমাদের জিপ বিশ মিনিটে তোমাকে পাহাড়ের ঢালে কুকুর-খামারে নিয়ে যাবে। কুকুর-ঘরে লেখা নাম দেখে তোমার কুকুর বের করবে, আমি যেমন দেখিয়েছি তেমন করে ওদের হার্নেস পরাবে, আর স্লেজে জুড়বে। তারপর ‘আহয়’ বলার সঙ্গে সঙ্গে ্লেজ নিয়ে তারা ছুট দেবে। প্রথমবারেই সবকিছু সঠিক করতে হবে। এই বরফের মরুভূমিতে ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ কমই পাওয়া যায়।’
বরফ-মোড়া লঙ্গিয়ার্বেন উপত্যকায় কুকুর-স্লেজ নিয়ে বেরিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা জনা দশেক প্রাণী। সবাই জীবনে প্রথম লঙ্গিয়ার্বেন এসেছি; প্রথম কুকুর-স্লেজ চালাতে যাচ্ছি। অচেনা উপত্যকা, অজানা বাহন। জনে জনে একটি করে ্লেজ নিয়ে দিকচিহ্নহীন সাদা তুষারের মধ্যে বেরিয়ে পড়তে হবে। হাতে ধরে আমাদের কেউ শিখিয়ে-পড়িয়ে পাকা করে দেবে, সে সুযোগ নেই। টেবিলের ওপর প্লাস্টিক-কুকুর রেখে ্লেজ ম্যানেজার রবার্ট সাহেব হার্নেস বাঁধার কায়দাটা শুধু একবার দেখিয়ে দিয়েছে। আর বলে দিয়েছেঃ কুকুরের গায়ে কোনো লাগাম থাকে না; ্লেজের ডানে ভর দিলে কুকুর ডানে মোড় নেয়, বাঁয়ে ভর দিলে বাঁয়ে মোড় নেয়; থামাতে হলে লাঙলের মতো ব্রেকটা বরফে গেঁথে ফেলতে হয়। পইপই করে বলেছে, আমরা যেন কখনোই একে অন্যের কাছাকাছি না যাই। এক ্লেজ আরেক ্লেজের কাছে এলে দুই দল কুকুরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী লড়াই শুরু হতে পারে।
স্লেজ হাঁকানোর কাজে আমি অবশ্য আর সবার মতো আনাড়ি নই। গাছ থেকে ঝরে পড়া সুপারির খোলে বসে শৈশবে অনেক ্লেজ-্লেজ খেলেছি। খেলার সাথিরা পালা করে সে স্লেজ টেনেছে। বহুকাল পর আজ আবার স্লেজে বসতে যাচ্ছি। এ ্লেজ টানবে তুষারকন্যা, অপচ্ছায়া, হারকিউলিস প্রভৃতি নামের সারমেয়গুলো। উত্তেজনা আর রোমাঞ্চ আজ শৈশবের চেয়ে কোনো অংশে কম হচ্ছে না। আজ থেকে ১০০ বছর আগে ্লেজ নিয়ে পিয়েরি প্রথম উত্তর মেরু জয় করেছিল। রঙ্গ করে লঙ্গিয়ার্বেনের অনেকেই এ যুগের পিয়েরি আখ্যা দিয়েছে আমাদের। পিয়েরির ৫০০ কিলোমিটার পথ যে আমরা রাশিয়া থেকে চার্টার করা বিমানে পার হয়েছি, সেটা নিয়েই তাদের এ রসিকতা। উত্তর মেরুর বরফ-টুপির ওপর আমরা মাত্র ৪২ কিলোমিটার ম্যারাথন দৌড়ে যোগ দিয়েছি; তাও দুনিয়ার তাবৎ আধুনিক কলাকৌশলের সহায়তা নিয়ে। উত্তর মহাসাগর ঢেকে থাকা ভয়ঙ্কর এই বরফ-টুপির পুরোটা পিয়েরি পার হয়েছিল তার আদিম পোশাক আর যন্ত্রপাতি নিয়ে। সঙ্গে ছিল কুকুর-স্লেজ, কয়েকজন ইনুইট আদিবাসী আর অদম্য মনোবল।
কুকুর-খামারের পথে রওনা হওয়ার আগে সবাই আইস-স্যুটে আপাদমস্তক ঢেকে, মাথায় হেলমেট চড়িয়ে শরীরটাকে শীতল বাতাসের জন্য দুর্ভেদ্য করার প্রয়াস পাচ্ছে। স্লেজে চড়ে লঙ্গিয়ার্বেন উপত্যকায় ঘণ্টাখানেক চলার পর পৃথিবীর কোনো পোশাকই নাকি শরীর গরম রাখতে পারে না। কিছুক্ষণ পর পর স্লেজ থামিয়ে বরফের মধ্যে ডন-বৈঠক দেওয়াই শরীর গরম রাখার একমাত্র উপায়। লঙ্গিয়ার্বেন এ পৃথিবীর সর্ব-উত্তরের এক দ্বীপপুঞ্জ, যেখানে মানুষের বাস আছে। চিরকালের মতো বরফ-চাদরে ঢেকে থাকা এ দ্বীপে কোনো মানুষ থাকার কথা নয়। শত বছর আগে এক কয়লাখনি আবিষ্কৃত হওয়ায় এখানে প্রথম মানুষ আসতে শুরু করে। খনির কয়লা এখন শেষ। অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় মানুষের যাতায়াত আছে বলে আজও এখানে মানুষের বসতি টিকে আছে। লঙ্গিয়ার্বেনের বাসিন্দা মানুষের সংখ্যা ৭০০, মেরুভল্লুকের সংখ্যা ৩০০। এই চির তুষারের দ্বীপে যে শিশু বড় হয়েছে, সে কখনো কোনো গাছ, ফুল, প্রজাপতি-কিচ্ছু দেখেনি।
বৃক্ষলতাহীন লঙ্গিয়ার্বেন উপত্যকায় সাপ, বিচ্ছু কিংবা মশার কামড়ে আমরা কেউ মারা পড়ব না, সেটা নিশ্চিত। আমাদের শুধু ভাবতে হবে শীত আর মেরুভল্লুক থেকে আত্মরক্ষার কথাটা। শীতের বিরুদ্ধে আমরা যে যা পেরেছি, করেছি। আমাদের দলপতি কাঁধে বন্দুক ঝুলিয়ে নিয়ে মেরুভল্লুককে দূরে রাখার ব্যবস্থাটা পাকা করলেন। সকাল আটটা নাগাদ আমরা কুকুর-খামারে এলাম। কুকুর আমাদের মতোই প্যাক অ্যানিমেল বা দলপ্রাণ জীব। নিজ দলের সদস্যের সঙ্গে সখ্য আর অন্য দলের সদস্যের সঙ্গে শত্রুতাটা স্বভাবজাত। পরামর্শমতো আমি কিছুক্ষণ আমার কুকুরদের সঙ্গে খেলা করলাম, যাতে তারা আমাকে তাদের দলের সদস্য করে নেয়। তারপর সযত্নে তাদের গায়ে হার্নেস পরাতে থাকলাম। হার্নেস পরানোর কাজটা সহজই হতো, যদি হাতে চামড়ার বিশাল দস্তানাজোড়া না থাকত। হার্নেস আর দস্তানা নিয়ে ধস্তাধস্তির পর একসময় স্লেজে-কুকুরে সংযোগ প্রতিষ্ঠা হলো। স্লেজে জুড়ে দেওয়ার পর কুকুর শান্ত রাখা এক কঠিন কাজ। তখনই ছুট দেওয়ার জন্য লাফালাফি আর শোরগোল করে তারা পুরো উপত্যকা কাঁপিয়ে তুলল। বরফের মধ্যে ধাতব চিরুনির ব্রেক ঠেসে ধরে ্লেজ স্থির রাখতে হলো।
একে একে সব কটি ্লেজ তৈরি হলে দলপতি তার ব্রেক ওঠাল। অমনি তার কুকুরের দল পড়িমরি করে দিল ছুট। তখন বাকি ্লেজের কুকুরগুলোকে বাগ মানাতে আমরা হয়রান। ছুটে চলার জন্য তাদের এ ব্যগ্রতার কোনো ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। এক স্লেজ থেকে আরেকটির সম্মানজনক দূরত্ব রাখার জন্য এক মিনিট পর পর আমরাও একে একে ব্রেক তুললাম। বিশাল ধবল পাহাড়ের গা বেয়ে খুদে খুদে কালো সরীসৃপের মতো আমাদের স্লেজের কাফেলা চলতে থাকল। ওয়েস্টার্ন সিনেমায় ছয় ঘোড়ার স্টেজকোচ হাইজ্যাক করে হাইওয়েম্যানকে ছুটে যেতে যারা দেখেছে, তারা আমাদের অবস্থা কিছুটা কল্পনা করতে পারবে। খানাখন্দ, চড়াই-উতরাই না মেনে টপ গিয়ারে শুধু ভাগতে থাকো। কুকুরের গতি কমানোর একটাই উপায়-স্লেজের ব্রেকটা বরফে ঠেসে ধরা। কিন্তু বারো জোড়া পা শূন্যে তুলে ছুটছে এমন বাহনের গতি এভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে কি কোনো যাত্রীর হাত ওঠে!
এই ঠুনকো স্লেজ দিয়ে এ ভয়ঙ্কর পাহাড়গুলো কী করে যে আমরা পার হব, সে ভাবনাটা খুব সুখকর হচ্ছিল না। আটটি হালকা কাঠের টুকরোর মাঝে চামড়ার এক চাদর ঝুলিয়ে সেকেলে আরামকেদারার মতো তৈরি এ বস্তুটি ছয় দস্যুর এই টানাটানির মধ্যে কতক্ষণ টিকে থাকবে কে জানে! তবে এমন অগম্য প্রান্তরে হাজার হাজার বছর ্লেজই যে মানুষের একমাত্র বাহন ছিল, সে তথ্য আমার ফিকে হওয়া সাহসে একটু রং ফিরিয়ে দিচ্ছিল। পাহাড়ের পর ধবল পাহাড় পার হচ্ছি। দারুণ শীতের কামড় আর সহজাত শঙ্কা ছাড়া কোনো কষ্ট নেই। দূরে দলনেতার বিউগল বাজল। এর অর্থ, আমাদের বিরতির সময় হয়েছে, এখন বরফে ব্রেক ঠেসে ধরো আর কুকুরের পাল থেমে গেলে ্লেজের ঝোলা থেকে বেরিয়ে গা গরম করার কসরত শুরু করো। আমাকে বরফের ওপর ডন মারতে দেখে কুকুরগুলো কুণ্ডলী দিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ওরা বুঝতে পেরেছে, এখন বিশ্রামের সময়।
মাত্র পনেরো মিনিট পর দলনেতার দ্বিতীয় বিউগলের আওয়াজ হতে না-হতে আমার কুকুর সব কুণ্ডলী ভেঙে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ওরা ভালোই জানে, এখন আবার ছোটার সময়। ওদের গা ঝাড়া দিতে দেখে কেন জানি আমার মনটা খুব চাঙা হয়ে উঠল। তুচ্ছ এক সংকেতে এমন চনমনে হয়ে দাঁড়াল তারা যে কোনো ক্লান্তি নেই, নেই কোনো দ্বিধা; ছোটার জন্য তক্ষুনি রেডি, শুধু ব্রেকটা ওঠালেই হলো। যেন ওরা বলল, এ পাহাড়ে তো তাদের দাদার দাদারা স্লেজ নিয়ে গেছে হাজারবার; এটা পার হতে আবার চিন্তা কিসের! আমার মনে পড়ল যে আমাদের পূর্বপুরুষও এ পথে গেছে লক্ষবার; এখানে আবার বিঘ্ন কিসের!
তারপর, নির্বিঘ্নেই গেল সারাটা দিন। দিনের শেষে হার্নেস খুলে আমার ছয় বন্ধু থেকে বিদায় নেওয়াটা হলো সেদিনের সবচেয়ে কষ্টের অনুভূতি।

ইনাম আল হক
সূত্রঃ প্রথম আলো, ডিসেম্বর ০৬, ২০০৮

Sending
User Review
0 (0 votes)

One Response

  1. ASIF February 28, 2013

Add Comment