পাহাড়, সমুদ্র, ঝরনা, দ্বীপ—একসঙ্গে এত কিছু কীভাবে সম্ভব!

অবশ্যই সম্ভব। কক্সবাজারে গেলেই দেখা হয়ে যাবে সব। দুর্গাপূজা আর আশুরার ছুটিতে পরিকল্পনা হলো কক্সবাজারে যাওয়ার। ওই সময়ে কক্সবাজারে চাপ পড়বে শুনেই যাওয়া-আসার বাসের টিকিট, হোটেল বুকিংয়ের কাজ শেষ করা হলো। ২৯ সেপ্টেম্বর রাত ১০টায় আমাদের যাত্রা শুরু হলো। স্ত্রী আইরিন আসাদ তো আছেনই, আরও সঙ্গী হলেন সহকর্মী তরিকুল ইসলাম এবং তাঁর স্ত্রী আয়েশা আক্তার।

সড়কে গাড়ির চাপ থাকায় কক্সবাজার পৌঁছতে পৌঁছতে পরদিন বিকেল। হোটেলে নেমে আনুষ্ঠানিকতা শেষে কক্সবাজার কলাতলী সমুদ্রসৈকতে থাকলাম সন্ধ্যা অবধি। সন্ধ্যা নামার পর চোখে পড়ল বেশ বড় এলাকাজুড়ে নানান রঙিন বাতির খেলা। কাছে যেতেই দেখা গেল বেশ বড় এলাকাজুড়ে বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরি এক রেস্তোরাঁ। সি ল্যাম্প নামের এই রেস্তোরাঁয় সামুদ্রিকসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার পাওয়া যায়। সমুদ্রের ঢেউ দেখা আর গর্জন শোনার জন্য দারুণ এক আয়োজন। পরিবার বন্ধুদের নিয়ে জম্পেশ আড্ডা দিচ্ছেন অনেকে। সেখান থেকে ফিরে এলাম সুগন্ধা সৈকত পয়েন্টের কাছে। বেশ কয়েকটি দোকানে সামুদ্রিক তাজা মাছের পসরা বসেছে। মাছ নির্বাচন করে দিলেই সঙ্গে সঙ্গে ভেজে দেওয়া হয়। আমরা নিলাম এক জোড়া রুপচাঁদা আর বিশাল এক কোরাল মাছ! স্বাদ যেন এখনো লেগে আছে! এরপর অনেক রাত পর্যন্ত সময় কাটল সুগন্ধা সৈকত পয়েন্টে। কক্সবাজারে বেশ ভিড় দেখে রাতেই পরিকল্পনা হলো, কিছুটা নিরিবিলিতে সময় কাটানোর জন্য মহেশখালী দ্বীপে যাব।

সকালে নাশতা সেরে নিয়ে অটোরিকশায় করে চলে গেলাম কক্সবাজারের ৬ নম্বর ঘাটে। শহর থেকে কিছুটা দূরে। আধা ঘণ্টা সময় লাগে সেখানে যেতে। মহেশখালী দ্বীপে যাওয়ার রাস্তা বলতে ট্রলার আর স্পিডবোট। স্পিডবোট বেশ গতিসম্পন্ন বলে যেতে সময় কম লাগে। ঢেউয়ের মাথায় চড়ে চড়ে চলা শুরু করল স্পিডবোট। বাঁ দিকে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ প্যারাবন। এখানে আছে কেওড়া, সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। বিশ মিনিট পরেই পৌঁছলাম। নেমেই একটা ছোট্ট সেতু। সেতুর দুই পাশে ঘন বন। পানির ওপর জেগে থাকা এই বনের নিচে গাছের শ্বাসমূল দেখা যাচ্ছে। সমুদ্র থেকে ওই সেতু লোকালয়ে মিশেছে। লোকালয়ের শুরুতে বেশ কয়েকটি ডাব আর শুঁটকির দোকান। এখানের শুঁটকিপল্লির বেশ নামডাক আছে।

রাখাইন পাড়ায় বৌদ্ধমন্দির দিয়েই শুরু করা হলো দ্বীপ ঘুরে দেখার পালা। দুটি বৌদ্ধমন্দির আছে এখানে। বৈচিত্র্যময় নির্মাণশৈলী আর মন্দিরের প্রবেশমুখে সিংহ আর হাতির মূর্তিগুলোও দৃষ্টি কাড়ে। এরপর উঠতে শুরু করলাম মৈনাক পাহাড়ে। বেশ উঁচু এই পাহাড়ে ওঠার জন্য সিমেন্টের তৈরি সিঁড়ির আলাদা রাস্তা আছে। তবে পাহাড়ের গা দিয়েও উঠে যাচ্ছেন অনেকে। পাহাড়ের একদম চূড়ায় দাঁড়িয়ে দেখা হলো নিচের ঘন সবুজ বন আর লোকালয়। এখানেই আছে আদিনাথ মন্দির। দুই ঘণ্টায় ঘুরে দেখা শেষ হলো মহেশখালীর দ্বীপ।

পরদিনের বিকেলে গন্তব্য একসঙ্গে সমুদ্র, পাহাড় আর ঝরনা দেখা। মাইক্রোবাস বা দ্রুতগতির কোনো যান নয়, ঠিক করা হলো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। কলাতলী মোড় থেকে ৮০০ টাকায় যাওয়া-আসার জন্য ঠিক হলো অটোরিকশা। মেরিন ড্রাইভ সড়ক শুরু হলো সেখান থেকে। শহরের পথ যেই শেষ হলো, অমনি চোখে পড়ল বাঁ দিকে উঁচু উঁচু পাহাড় আর ডানে সুবিশাল সমুদ্র। পথ চলতে চলতে এক জায়গায় পানির কলকল শব্দ। মানুষের কোলাহল। কাছে যেতেই দেখা মিলল হিমছড়ির ঝরনা। ঝরনা দেখে পানি ছুঁয়ে আবার মেরিন ড্রাইভের সড়কে ফিরে এলাম। থামলাম এবার ইনানী সৈকত। সৈকতের ফাঁকা জায়গায় মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন অনেকে। বিকেলে রোদের তেজ বেশি থাকায় সৈকতের ছাতার নিচে বসলাম কিছুক্ষণ। তেজ কমে যাওয়ার পর আমাদের ফেরার আয়োজন। একটা ফাঁকা জায়গায় নামলাম। জনবসতি নেই এখানে। মানুষের আনাগোনা কম। একদম নির্জন। পেছনে বড় পাহাড়। সমুদ্রের তীর ঘেঁষে বড় বড় বেশ কয়েকটা সাম্পান নৌকা। দুই পাশে সুচালো এই নৌকার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য। মনে হচ্ছে যেন ছবির কোনো দেশ। পাড়ার আর সমুদ্রের এই মিলনস্থলে ছবি তুলতে তুলতে টুপ করে ডুবে গেল সূর্য। আমরা আবার ছুটতে শুরু করলাম ব্যস্ত শহরের দিকে…।

যেভাবে যাবেন

মহেশখালী যেতে চাইলে কক্সবাজার শহর থেকে অটোরিকশায় করে কক্সবাজারের ৬ নম্বর ঘাট, এরপর ট্রলার বা স্পিডবোট। মেরিন ড্রাইভ সড়কে যেতে চাইলে শহর থেকে চুক্তিভিত্তিক অটোরিকশা ঠিক করে নিতে পারেন। পথেই পড়বে ইনানী আর হিমছড়ির ঝরনা।

মোছাব্বের হোসেন
সোর্স – প্রথম আলো