ছবি : পুনাখায় মন্দির। এই মন্দিরেই ভুটানের বর্তমান রাজার বিয়ে হয়

পারো বিমানবন্দরে নেমেই দেখি দূরে নীল (!) পাহাড়। তারপর ভুটানে পাহাড় আর নদীই আমাদের সঙ্গ দিল সর্বক্ষণ। কেবল বদলে গেল পাহাড়ের রং আর নদীর নাম। আকাশে হেলান দিয়ে কখনো ঘুমায় সবুজ পাহাড়, কখনো নীল, কখনো সোনালি…আর একই নদী জায়গা বদলের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে নেয় নিজের নাম। পারোর পাশ দিয়ে কুলকুল করে বইতে বইতে পাচু, থিম্পুর আশপাশে বয়ে যায় খরস্রোতা থিমচু। পুনাখায় গিয়ে দেখি নদীর দুটো মুখ। জানলাম, একটা ছেলে আরেকটা মেয়ে—মচু ও ফচু!

আকাশপথে ভুটানে যেতে আগে থেকে ভিসা নেওয়ার কোনো ঝামেলা নেই। ওহ্ শান্তি। বিমানবন্দরে নেমেই পাবেন প্রবেশের অনুমতি। বিদেশিদের জন্য এই অনুমতি ব্যয়সাপেক্ষ, কিন্তু সার্কের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশিদের জন্য ফ্রি! তবে পারো ও থিম্পু ছাড়া অন্য শহরে যেতে হলে থিম্পু থেকে নিতে হবে সরকারি অনুমতি, সেটাও নেহাতই আনুষ্ঠানিকতা। প্রথমবার আমাদের গাড়ির চালক কারমা নিজেই উদ্যোগ নিয়ে কাজটা সহজ করে দিয়েছিলেন।

মানুষের জন্য ছাড় থাকলেও সিগারেটের জন্য ছাড় নেই ভুটানে। দিতে হবে উচ্চমূল্য। আর প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ মানে নিষিদ্ধই। ভুটানে গেছি দুবার। জুন-জুলাই মাসে। এ সময়টা ওদের ‘অফ সিজন’ আর ‘টু হট’। আমাদের জন্য হালকা শীত। কখনো কখনো বৃষ্টি। হোটেল রিসোর্টের ভাড়ায় ছাড়।

আমরা বলি জিডিপি। মোট দেশজ আয়। আর ওরা বিশ্বাস করে জিএনএইচ (গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস)। মোট জাতীয় সুখ। তাই তো! দিনের শেষে সুখই তো আসল কথা। ভুটানে যত দিন ছিলাম, রিসোর্টের ঘরের দরজা বন্ধ, স্যুটকেসের তালা বন্ধ নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা করতে হয়নি একদিনও। ওরা খুব নিয়ম মেনে গাড়ি চালায়। তাই পাহাড়ি পথেও ভয় লাগেনি। বরং দুনয়ন ভরে দেখেছি পাহাড়মালা। থিম্পু থেকে পুনাখার পথে হঠাৎ থেমে ছুঁয়েছি শীতল ঝরনাধারা। মাঝপথে থামলাম দোচ্লায়। প্রায় ১০ হাজার ফুট ওপরে। মেঘ এসে ঘিরে ফেলল আমাদের। ঢাকায় বন্ধুকে খুদেবার্তা পাঠালাম, ‘আমরা মেঘের ভেতর।’ বারিধারা থেকে ধানমন্ডি যেতে যেতে অফিস-ফেরতা বন্ধু উত্তর পাঠাল, ‘আমরা যানজটের ভেতর।’

গেলাম রয়েল ভুটান পার্কে। জাতীয় উদ্যান। সঙ্গের শিশুরা দৌড়াতে শুরু করল। হারে রেরে রেরে আমায় ছেড়ে দেরে দেরে…। হঠাৎ দেখি লেখা ‘রডোডেনড্রন ওয়াক’। ছোটবেলায় পড়া রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতা ভর করল নস্টালজিয়ায় ‘…উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডোডেনড্রন গুচ্ছ।’

এই গাছ না দেখে কি যাওয়া যায়? দেখলাম। ছবি তুললাম। তবে উদ্যান থেকে ফিরে গিয়ে দেখি আমাদের দলের একজনের পায়ে জোঁক কামড়ে দিয়েছে। রক্ত আর থামেই না। তখন যত দোষ রডোডেনড্রনের…।

ভুটানের সাধারণ মানুষ রাজাভক্ত। মাস তিনেক পর ছিল রাজার বিয়ে। কিন্তু গাড়ির চালক, রিসোর্টের মালিক, সবজিবিক্রেতা, বৌদ্ধমন্দিরের ভিক্ষু—সবার উৎসাহ আর ব্যস্ততা দেখে মনে হচ্ছিল, ওদের কোনো নিকটাত্মীয়ের বিয়ে! ওদের আর দোষ কী? পুনাখার মন্দিরের কাঠের কারুকাজ আর শহরের মতো আয়তন দেখে আমরা আগেই মুগ্ধ। পরে যখন দেখলাম, এই মন্দিরেই রাজার বিয়ে হয়েছে, তখন আমরাও যেন নৈকট্য অনুভব করলাম। ভুটানে আপনি যে শহরেই যান না কেন, আপনার চোখে পড়বে প্রার্থনা-ঘণ্টা। ওরা বিশ্বাস করে, এই ঘণ্টা পারে মনের ইচ্ছা পূরণ করতে। ওদের বিশ্বাসের কথা কাপড়ে লিখে ঝুলিয়ে রাখে পাহাড়ের গায়ে গায়ে।
ভুটানে মেয়েরা খুব পরিশ্রমী। থিম্পুর জামবিয়াং, পারোর গাংতিসহ চারটি রিসোর্টেই দেখলাম মেয়েরাই মূল চালিকাশক্তি। পাহাড়ের ধাপে ধাপে ভারী স্যুটকেস নিয়ে ওঠানামা করতেও তাদের ক্লান্তি নেই। পর্যটকদের দেখাশোনা করার জন্য কেজো ইংরেজিও তাদের জানা।

এমনিতেই ভুটানে মানুষ কম। গাড়ি কম। শব্দ কম। আর রাতের ভুটান? সে তো রাজধানী থিম্পুর রিসোর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে শুধুই নিঃশব্দ সৌন্দর্য উপভোগ করা। দূরে পাহাড়ের ওপরে ওই যে বাতি, তাতে বোঝা যায়, বুদ্ধের বিশাল মূর্তিটি ধ্যানরত, আর আপনার কানে একটাই শব্দ—থিমচুর বয়ে চলা।

দ্বিতীয়বার যখন ভুটান গেলাম, তখন সার্ক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক চলছিল। আমরা পারোতে গিয়ে দেখি, বিমানবন্দর থেকে একে একে পতাকাবাহী গাড়ি বের হচ্ছে। আমাদের গাড়ি পথের পাশে থেমে আছে।

গাড়িতে চালক ছাড়া আমরা ছোট-বড় সাতজন। সাতজনই অপেক্ষা করছি বাংলাদেশের পতাকাটা দেখার জন্য। এবার নিশ্চয়ই দেখা যাবে। না, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান…অতঃপর ভুটান। হয়তো আগে-পরে চলে গেছে। আমাদের মনটায় অতৃপ্তি। ভিনদেশে নিজের দেশের পতাকা দেখার এই আকুতিই কি দেশপ্রেম?

সুমনা শারমীন
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১২