আমেরিকায় এখন চমত্কার গ্রীষ্মকাল। চমত্কার কেন বলছি জানেন? আমাদের দেশের মতো ভাপসা গরমটা নেই, বরং এখানকার ‘সামার’ই সম্ভবত বাংলাদেশের বসন্ত।
প্রকৃতি যে মানুষের মনে প্রভাব ফেলে, সে তো আর নতুন তথ্য নয়। এখানেও তা-ই দেখলাম। প্রকৃতির প্রভাবে মানুষের মেজাজ ফুরফুরে, মুখে হাসি, আর চলায়-বলায় খুশির ছন্দ। নারী-পুরুষের পোশাকেও দেখলাম বসন্ত ভর করেছে। ভাবতে পারেন কোনো তরুণ টিশার্ট তো টিশার্ট, একেবারে স্যান্ডো গেঞ্জি, শর্টস আর হাওয়াই চপ্পল পরে ট্রেনে-বাসে ভ্রমণ করছে। কবি জন ডান লিখেছিলেন—‘হোল্ড ইয়োর টাং, অ্যান্ড লেট মি লাভ।’ কিন্তু মার্কিনদের চুম্বন-প্রবণতা দেখে মনে হয় না, ভালোবাসার জন্য কোনো অবকাশের প্রয়োজন আছে, জগত্সংসারে যাবতীয় ব্যস্ততা ও কোলাহলের মধ্যেও থেমে নেই ভালোবাসার অভিব্যক্তি। এক বাঙালি বন্ধু ঠাট্টা করে বললেন, ‘আমরা যা গোপনে করি, তা ওরা করে প্রকাশ্যে। আর আমরা যা প্রকাশ্যে করি, তা ওরা করে সর্বসমক্ষে।’ যেমন? ‘যেমন ভালোবাসার জন্য আমাদের প্রয়োজন নির্জনতার আড়াল, ওদের তার দরকার নেই। আবার আমাদের দেশে অনেকেই পথের পাশে থেমে পড়েন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে, সেটা ওরা কল্পনাও করতে পারে না।’ যদ্দেশে যদাচার।
যা-ই হোক, বলছিলাম সামার নিয়ে। এই সামারে সবাই মেতে আছে আনন্দ উত্সবে। নিউইয়র্কের মতো ব্যস্ত শহরটাতেও দেখলাম খেলা-মেলার অভাব নেই। যেমন ম্যানহাটনের একটি ব্যস্ত রাজপথে গাড়িঘোড়া চলাচল বন্ধ করে দিয়ে একদিন চলল চীনা পণ্যের মেলা। আবার অন্যদিন এই ম্যানহাটনেই দেখলাম হাজার হাজার বিচিত্র পোশাকধারী মানুষের আনন্দ শোভাযাত্রা। নিউইয়র্ক এখন পর্যটকদের ভিড়ে মুখর। এমনিতেই এই মহানগরে বাস করে ৩৬ জাতির মানুষ, এর ওপর পর্যটকেরা এসে আরও বর্ণময় করে তুলেছে এই শহর। ফলে সাবওয়েতে, বাসে, ফুটপাথে কে যে কোন দেশের মানুষ, তা বোঝার উপায় নেই। কান পাতলে শোনা যাবে সঙ্গীদের কেউ কথা বলছে চীনা ভাষায়, কেউ ফরাসি বা হিন্দিতে, কেউ বা অকৃত্রিম বাংলায়। শুধু বাংলা বললে বোধহয় যথার্থ বলা হলো না, পথ চলতে ‘ভাইছা’, ‘মনু’ বা ‘আবে হালায়’ শব্দগুলোও কর্ণকুহরে প্রবেশ করবে আপনার।
এ প্রসঙ্গে তাহলে আমাদের ভাই-বেরাদরদের কথা একটু বলি। প্রথম দিন জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে নিউইয়র্ক শহরটার গতিপ্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করছিলাম। বহু লেনে বিভক্ত বিশাল রাস্তা, অসাধারণ যানবাহন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, এর পরও যানজট কিছুটা আছে। চারপাশে তাকাচ্ছিলাম হাবাগোবার মতো। হাজার হোক আমেরিকা নামটির সঙ্গেই ভয়-সমীহ-স্বপ্ন প্রভৃতি শব্দ ও অনুষঙ্গ এসেই পড়ে। কিন্তু বাঙালি-অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটসের মোড়ে পৌঁছে সমীহের ভাবটা উধাও। এ যে দেখি ঢাকা শহরের শাহবাগের মোড়। ডানে-বাঁয়ে সব বাঙালি। দোকানপাটে বাংলা সাইনবোর্ড, রাস্তার ওপর সিগারেটের খোসা ছাড়াও ছেঁড়া কাগজপত্রসহ নানা আবর্জনা। আর হোটেল-রেস্তোরাঁয় বিশুদ্ধ বাঙালির ভাত-মাছ, রুটি-মাংসের আয়োজন। কোনো পণ্যের দাম জানতে চাইলে দোকানি জানাচ্ছেন পাঁচ, দশ বা বিশ টাকা। মানে কী? এখানে দেশীয় মুদ্রার প্রচলন আছে? না, ক্রেতা-বিক্রেতারা জানালেন, এখানে ডলারকেই ডাকা হচ্ছে টাকা নামে। এক ডলারের মূল্য যে প্রায় ৭০ টাকার মতো, এ কথা যেন ভুলে বসে আছেন সবাই। ‘প্রবাসে বাঙালি সজ্জন’ বলে একটি কথা আছে। এ কথার সত্যতা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি প্রবাসী বন্ধুদের আন্তরিকতা আর ভালোবাসায়।
অনুকূল আবহাওয়ার কারণে আমেরিকাজুড়ে এখন অনুষ্ঠান-উত্সবের নানা আয়োজন লেগে আছে। প্রবাসী বাঙালিরাও পিছিয়ে নেই। সন্দ্বীপ বা সীতাকুণ্ড সমিতির পিকনিক, সিলেট বা বিক্রমপুর সমিতির পুনর্মিলনী যেমন আছে, তেমনি ঢাকা বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের অনুষ্ঠানও চলছে। বাবা-মা বা পরিবারের স্বজনদের সান্নিধ্যবঞ্চিত যাঁরা, তাঁরাই বন্ধুদের নিয়ে যেকোনো একটি উপলক্ষ তৈরি করে দেশ থেকে ১২ হাজার মাইল দূরে গড়ে তুলছেন একটি স্বদেশ, স্বজন-পরিমণ্ডল।
ফোবানা, এবিসি ও বঙ্গ সম্মেলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলোও চলছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেটে। সেখানে প্রবাসী বাঙালিরা যেমন জড়ো হচ্ছেন, তেমনি বাংলাদেশ থেকেও উড়ে যাচ্ছেন কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা। আমিও গিয়েছিলাম এ রকমই একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। প্রবাসী সাহিত্যিক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, পূরবী বসু, লেখক-কলামিস্ট হাসান ফেরদৌসের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠানটির মূল উদ্যোক্তা ছিলেন এখানকার মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কর্ণধার বিশ্বজিত্ সাহা।
‘আন্তর্জাতিক বাংলা উত্সব ও বইমেলা’ শিরোনামের এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ছিলেন বাংলা গদ্যের একজন প্রধান শিল্পী হাসান আজিজুল হক। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছিলেন জনপ্রিয় লেখক-ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ, সমরেশ মজুমদার, শিল্পী লোপা মুদ্রা মিত্র, নকুল কুমার বিশ্বাস, মেহের আফরোজ শাওনসহ কয়েকজন। তিন দিনের অনুষ্ঠানে প্রবাসী বাঙালিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে সত্যি মন ভরে গেছে।
নিউইয়র্ক শহরের ব্যাপ্তি বিশাল। অল্প কয়েক দিনে এই শহরের সবকিছু দেখা দুঃসাধ্য। তবে জনবহুল ব্যস্ত শহরটি এত সুন্দরভাবে বিন্যস্ত, ঠিকানা জানা থাকলে গন্তব্যে পৌঁছানো খুব কঠিন নয়। বড় বড় সমান্তরাল রাস্তা এভিনিউ এবং এগুলোকে আড়াআড়িভাবে কেটে বেরিয়ে যাওয়া তুলনামূলক অপ্রশস্ত রাস্তাগুলো স্ট্রিট হিসেবে পরিচিত। স্ট্রিটের নম্বর এবং এভিনিউয়ের নাম রাস্তার পাশেই লেখা থাকে। চোখ-কান খোলা থাকলে তাই পথ হারানোর কোনো উপায় নেই। আর তিন-চার স্তরের অসাধারণ পরিবহনব্যবস্থার কারণে দ্রুত সময়ে নানা দূরত্বে যাতায়াতের ব্যবস্থা তো আছেই। মাটির নিচে চলছে পাতালরেল (সাবওয়ে), মাথার ওপর স্কাই ট্রেন, রাস্তায় হাজারো বাস-ট্যাক্সি—সব মিলিয়ে যাতায়াত আর যোগাযোগের ক্ষেত্রে নিউইয়র্কের মতো গতি পৃথিবীর কোনো শহরে আছে কি না সন্দেহ।
কম সময়ে এখানকার দ্রষ্টব্য স্থানগুলো ঘুরে আসার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে ট্যুরিস্ট বাসের টিকিট কাটা। ছাদখোলা এই বাসগুলোর ভাড়াও খুব বেশি নয়—২০ ডলার বা এ রকম কিছু। এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, জাতিসংঘ সদর দপ্তর, স্ট্যাচু অব লিবার্টির মতো বহুশ্রুত স্থাপনাগুলো এভাবে দেখে নেওয়া যায়। তবে দর্শনীয় স্পটগুলোর বুড়ি ছুঁয়ে আসার তাড়াহুড়ো যদি আপনার পছন্দ না হয়, সে ক্ষেত্রে ভালো ব্যবস্থা হচ্ছে প্রবাসী বন্ধুদের সঙ্গ নেওয়া। আমি তো প্রবাসী বন্ধু মতিন, রতন, শ্যামল, রিমন, রিমিদের সঙ্গে ঘুরেছি দিনভর।
শতাধিক তলার এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের অবজারভেটরি টাওয়ার থেকে নিউইয়র্কের একটি বিরাট অংশ তো বটেই, নিউজার্সি, পেনসিলভানিয়া, কানেকটিকাট এবং ম্যাসাচুসেটসেরও অনেকটা দেখা যায়। শত শত পর্যটককে দেখলাম পাখির চোখে এই শহরটা দেখে নিচ্ছেন প্রাণভরে। অবজারভেটরি ম্যাপ, অডিও ট্যুর ইত্যাদি নানা সুবিধার জন্য টিকিটের মূল্যও নানা রকম—২০ থেকে ৩৩ ডলার পর্যন্ত।
স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখা হলো দূর থেকে। ভালোই হলো, প্রতীকী অর্থে গণতন্ত্র তো আসলে দূরেরই জিনিস।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ভেতরটা দেখার জন্য গাইডেড ট্যুরের ব্যবস্থা আছে। এখানে জাতিসংঘের স্মারক, স্ট্যাচু অব লিবার্টির প্রতিকৃতি-সংবলিত মগ, টিশার্ট, কোটপিন ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে খুব উচ্চ মূল্যে।
এই ভবনের প্রবেশপথে রাখা আছে বিশাল একটি ইস্পাতের গোলক। টুইন টাওয়ার থেকে এনে রাখা হয়েছে এটি। নয়-এগারোর হামলার পর এর একটি অংশ ভেঙে গিয়েছিল। সংস্কার করা হয়নি বোধ করি সেই নির্মম স্মৃতি উসকে দেওয়ার জন্যই।
টুইন টাওয়ারের ধ্বংসাবশেষ এখন গ্রাউন্ড জিরো। গ্রাউন্ড জিরো ঘিরে রাখা লোহার গ্রিলের বাইরে সেই ভয়াবহ ঘটনার বিভিন্ন তথ্য ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী দেখে উহ্ আহ্ করছেন শৌখিন পর্যটকেরা। এগুলোর সামনে ছবিও তুলছেন অনেকে। টুইন টাওয়ার হামলায় নিহতদের স্মৃতির উদ্দেশে গ্রাউন্ড জিরোর পাশ থেকে রাতে দুটি আলোকস্তম্ভ তৈরি করা হয়, যার নাম ট্রিবিউট ইন লাইট। রাতের আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে এই আলো দেখা যায় ২৫ মাইল দূর থেকেও।
আসলে দর্শনীয় বলে নিউইয়র্কে কোনো কিছুকে আলাদা করা যায় না। সবকিছুই যেন দর্শনীয়, বিশেষত তৃতীয় বিশ্ব থেকে যাওয়া এক নবাগতের পক্ষে। চারপাশের উন্নত জীবনযাত্রা, এত ব্যস্ততার মধ্যেও মানুষের মধ্যে অদ্ভুত এক শৃঙ্খলাবোধ, মার্জিত আচার, সহযোগিতা প্রবণতা—সবকিছু দিয়েই যেন জয় করে নেয় নিউইয়র্ক।
এমন বিশাল ব্যস্ত রাস্তাঘাটের পাশেই বড় বড় খোলা ময়দান, সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা পার্ক। সেখানে শ্রান্ত পথিকের অখণ্ড বিশ্রাম, তরুণীর রৌদ্রস্নান বা স্কুলের শিশুশ্রেণীর ছাত্রদের প্রকৃতিপাঠ। উচ্ছল আনন্দময় শিশুদের দেখে আমাদের ভাগ্যবিড়ম্বিত শিশুদের জন্য একটু কষ্ট হয়, কত অপ্রাপ্তিতে বড় হচ্ছে ওরা!
কুইন্স ব্রিজ, ব্রুকলিন ব্রিজ, ট্রাইবোরো ব্রিজের অপূর্ব নির্মাণশৈলী দেখে বিস্মিত হতে হয়, নদীর জলে সেই আলোকোজ্জ্বল সেতুর প্রতিফলন দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যায়।
সারা রাত ঘুমায় না নিউইয়র্ক। রাতে তার রূপের খোলতাই আরও বেশি। জ্যাকসন হাইটসের নাইট ক্লাবগুলো তখন ফেটে পড়ছে পানমত্তদের উল্লাসে। তবে কয়েক শ গজ পর পর সতর্ক অবস্থানে আছে পুলিশের গাড়ি। অপ্রীতিকর কিছু ঘটার উপায় নেই।
প্রায় ১৪ মাইল দীর্ঘ ম্যানহাটনের রাস্তাগুলো রাতে যেন লাস্য ও রহস্যময়ী হয়ে ওঠে। দৃষ্টিনন্দন ইমারতের সঙ্গে মানানসই এক জমকালো জীবন। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ লিখেছেন, ‘বিংশ শতাব্দীর মানবিক ধনসম্পদের সর্বোচ্চ ও বৈভবময় প্রতিমা ম্যানহাটন। হাজার হাজার বছর ধরে তৈরি মিসরের পিরামিডগুলোর চেয়ে এ ঐশ্বর্যময়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা বিস্ময়কর রোমের চেয়েও পেশিবহুল।’
সন্দেহ নেই, এই নগরের স্মৃতি দীর্ঘজীবী হয়ে থাকবে মনে। তবে এর চেয়েও বেশি মনে থাকবে প্রবাসী বন্ধুদের কথা, যাঁরা বিমানবন্দরে বিদায় জানাতে এসে অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন। বিমান থেকে জানালা দিয়ে তাকিয়ে শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছিলাম শহরটি। কিন্তু সব ছাপিয়ে মনে ভাসছিল প্রিয় প্রবাসীদের মুখগুলো। এই না হলে বাঙালি!

বিশ্বজিত্ চৌধুরী
সূত্র: প্রথম আলো, অক্টোবর ০৩, ২০০৯