ধর্ম আর ইতিহাসের গড়

জঙ্গলের মাঝখানে পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় কেল্লা। কেল্লার নাম বান্ধবগড়। বান্ধবগড়ের ইতিহাসে কত অবাক করা মোড়। সেই গড় দেখব না! পৌছে শুনলাম গাড়ি গড় পর্যন্ত যায় না, কিছুটা যায়, বাকি পথ হেঁটে যেতে হয়। তাতেই বা কী! দলের কেউ পঙ্গু বা অথর্ব তো নয়। গড়ে যাবার ইচ্ছের কথা শুনে হোয়াইট টাইগার ফরেস্ট লজের সহকারী ম্যানেজার জাভেদ মনসুরি প্রথমটা একটু থমকে গিয়েছিলেন। আমাদের উৎসাহ দেখে শেষে দুপুরের খাবার প্যাক করে দেওয়ার কথা বললেন।

চেনা বাহনচালক অনিল শর্মা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি ছোটাচ্ছে। ঝলমলে দিন, নীল আকাশ, অল্প অল্প হাওয়া। সকালের কনকনে ভাব মিলিয়ে এখন রীতিমতো মেজাজ ভাল করা আবহাওয়া। দেখতে দেখতে বান্ধবগড়ের জঙ্গল পাশে পড়ে রইল। আমরা হাজির হলাম গড়ের নীচে। সামনে কয়েক ধাপ সিঁড়ি। অনিল শর্মা আপাতত বিদায় নিলেন। এখন থেকে আমাদের সঙ্গী মানজিৎ সিংহ। কয়েক ঘন্টা আক্ষরিক অর্থে ওর হাত ধরা হয়ে চলতে হবে।

গড়ের সিংহ দরজা

সিঁড়ি দিয়ে উঠে আমাদের মুখে আর কথা নেই। সামনে বাধানো চত্ত্বরের এক ধারে জলাশয়ে সবুজ জল। পাশে উচু বেদির ওপর স্তেম্ভর আয়তনের শিবলিঙ্গ; তার পাশে শায়িত বিষ্ণুর বিশাল এক মূর্তি। অজন্তায় বুেদ্ধর মহাপরিনির্বাণের মূর্তি দেখেছি, তারপর বিষ্ণুর এই মূর্তি। কী বিশাল। না জানি পাথরটা কত বড় ছিল যা থেকে এই মূর্তি খোদাই করা হয়েছে। শিল্পীর দক্ষতায় মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। চারদিকে গাছপালা ঘেরা চত্ত্বর সবুজ শান্ত শীতল। শািন্ত এখানে হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায়; শািন্তর সুর থাকলে এ জায়গায় সঙ্গীতের প্লাবন বয়।

মূর্তির নাম শেষ শয্যা। শেষনাগের ওপর শায়িত বিষ্ণুর এই মূর্তি প্রায় ৫০ ফুট লম্বা; তৈরি হয়েছিল ১০০০ থেকে ১১০০ শতাব্দীর মধ্যে। কালচুরি রাজা যুবরাজদেবের মন্ত্রী গোলক এই মূর্তি তৈরি করেন। শেষ শয্যার পায়ের কাছে জলের ধারা জলাশয়ে এসে পড়ছে। এই হল চরণগঙ্গা নামে নদীর উৎস। বান্ধবগড়ের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাশের গ্রাম তালা হয়ে ২৪ কিলোমিটার দূরে সোন নদে চরণগঙ্গা পড়ে। পুরাণে বেত্রাবলী গঙ্গা বলে যে নদীর উেল্লখ সেটি আসলে এই চরণগঙ্গা। পুরনো নদী, তার মাহাত্ম্যও অনেক। রামনবমী আর জন্মাষ্টমীতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার তীর্থযাত্রী এখানে পুজো দিতে আসে। তাতে জঙ্গল আর পশুপাখির কী অবস্থা হয় তা না ভাবাই শ্রেয়।

শেষ শয্যায় বিষ্ণু। চরণগঙ্গার উৎস

শেষ শয্যা থেকে শুরু গড়ের রাস্তা। পাহাড়ের গা বেয়ে একেবেকে উঠেছে; খাড়া পথের অনেক জায়গাতে আলগা পাথর বিছানো। নীচে অনেক দূরে বান্ধবগড়ের জঙ্গল বিছিয়ে রয়েছে। হাফাতে হাফাতে উঠে ওই দৃশ্য দেখে হাফাতে ভুলে যেতে হয়। পাহাড়ি রাস্তার ধারে অতন্দ্র প্রহরীর মতো প্রাচীন মূর্তির সারি: বিষ্ণু নৃত্যরত গণেশ আরও অনেকে। এদের রক্ষার দায়িেত্ব কেউ নেই। রোদজলে প্রত্যেক দিন একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছে কবেকার এই সব পুরনো মূর্তি। আমরা ওপর দিকে উঠছি আর মনে হচ্ছে যেন ধীরে ধীরে পৃথিবী ছেড়ে উঠে যাচ্ছি। এখানে কোলাহল নেই, মানুষ নেই। শুধু নীল আকাশ, তাতে একলা পাখি। পাহাড়ের গায়ে ওই বিরল সাদা শকুনের বাসা। অনেক দূর থেকে পাহাড়ের গায়ে সাদা ছোপ দেখে বোঝা যায় ওরা ওইখানে বাসা বেধেছে। অনেক কসরত করে ওপরের পাথর থেকে বাসায় পাখি বসে থাকার ছবি তুলতে গিয়ে ব্যাপক বকুনি খেতে হল দলের লোকের কাছ থেকে। মানজিৎ নির্বিকার। ও জানে, ও সামনে থাকতে কারও পক্ষে পাহাড় থেকে পড়ে মরে যাওয়া সম্ভব নয়।

নৃত্যরত গণেশ

এক পাশে পাহাড়, অন্য দিকে জঙ্গল। সেই ঝোপঝাড়ের মধ্যে বুনো কুল আবিষ্কার করে আমাদের আহ্লাদের শেষ নেই। প্রথমে অবশ্য মানজিৎ কুল বলে বোঝাতে পারেনি। ছোট ছোট লাল ফল গাছ থেকে পেড়ে দিল, নামও হয়তো বলেছিল একটা, মনে পড়ে না। সন্তর্পণে মুখে দিতেই ফিরে গেলাম ছেলেবেলার দিনগুলোতে। স্কুলের সামনে চুরনওয়ালা যে ছোটছোট লাল টক কুল বলে বিক্রি করে এ তো সেই জিনিস! বলতেই মানজিৎ মহা উৎসাহে সায় দিল।

শকুনের বাসা

আমার দেখা আর পাচটা কেল্লার সঙ্গে তুলনা করলে বান্ধবগড়কে নিছক ফোর্ট বা ফোর্টের ধ্বংসস্তূপ বলে মেনে নেওয়া মুশকিল। দৌলতাবাদের ফোর্ট রীতিমত দুর্গ; শত্রুর হাত থেকে বাচার জন্য কত রকম বেন্দাবস্ত সেখানে। চেক রাজধানী প্রাগের বিশ্ববিখ্যাত কাসল ছোটখাট শহর।

লালকেল্লা বা গোলকোণ্ডায় শত্রুপক্ষের অদৃশ্য উপিস্থতির আভাস পাওয়া যায়। বান্ধবগড় অন্য রকম। এখানে কোনও সম্ভাব্য শত্রুর কাজকর্ম আন্দাজ করে আত্মরক্ষার বিচিত্র ব্যবস্থার নমুনা নেই। বান্ধবগড়ের কেল্লায় প্রাসাদ মিন্দর হ্রদ আর আছে বিষ্ণুর বিভিন্ন অবতার রূপের পাথরের মূর্তি। জল সরবরাহ শত্রুর মাথায় গরম তেল ঢালার ব্যবস্থা থেকে এ সব এত দূরে যে মাঝেমাঝে মনে হয় বান্ধবগড় বাস্তব জগতের নয়, কোনও কল্পনাপ্রসূত স্বেপ্নর রাজ্য থেকে খসে পড়েছে।

নীল আকাশে মাথা তুলে কচ্ছপ: কুর্ম অবতার

নীল আকাশের দিকে মাথা তুলে একটা কচ্ছপ: কুর্ম অবতার। পাথুরে প্রাঙ্গণের অন্যদিকে নানান দেবদেবীর মূর্তি ঝড়জল মাথায় করে দেওয়াল জুড়ে দাড়িয়ে। সেখান থেকে বেরিয়ে এগোতেই চোখে পড়ে মিন্দরের মতো বাড়ি তার ভেতরে বিশাল পাথরর মাছ। গোটা পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা বরাহ অবতারের বিশাল মূর্তি। দেখতে দেখতে মনে হতেই পারে বান্ধবগড় আসলে বিষ্ণুর প্রতি এক দীর্ঘ নমস্কার। বিষ্ণুকে প্রায় সব অবতার রূপেই পাওয়া যায় এখানে। তা ছাড়া আছে বান্ধবাধীশের মিন্দর। তবে কি শুধুই ধর্ম?

তা নয়। পুরনো মিন্দরের পাশে হ্রদের ধারে পুরনো রাজপ্রাসাদের ভগ্নাবশেষ এখনও তাকিয়ে দেখার মতো। জলের একধারে প্রাসাদ, অন্য দিকে মিন্দর। সময়ের কোপে ভেঙে পড়লেও মানুষের স্পর্শে মলিন নয়।
গোলাবারুদ রাখার ঘরটাও মনোরম। পাথরের দেওয়ালে ফুলের নকশা দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না। রসদখানায় কারুকাজের নমুনা বিরল। মানজিৎ ভেতরের গরাদ দেওয়া ঘর থেকে হাতি বাধার মতো মোটা দড়ি বের করল বটে কিন্তু আমার ধারণা তখনকার দিনে ওই মিন্দরের মতো ঘর কোনও মনোগ্রাহী কাজের জন্যই ব্যবহৃত হত।

রাজপ্রাসাদের ভগ্নাবশেষ

রাম মন্দিরের কিছুটা জায়গা জুড়ে বেতার ব্যবস্থার যন্ত্রপাতি রাখা থাকলেও মিন্দরে এখনও রীতিমত পুজো হয়। রাম লক্ষ্নণ সীতা এখানে নিিশ্চেন্ত দাড়িয়ে আছেন; আরও বহুকাল থাকবেন বলে মনে হয়।

গড়ে পৌছনোর রাস্তা খুব বেশি খাড়া না হলেও বেশ কষ্ট করতে হয়। কিন্তু সেই কষ্ট সার্থক। প্রাচীন গড়ের ত্রিসীমানায় কেউ নেই, শুধু প্রকৃতি, পাথর আর ইতিহাস। এমন মিশেল সচরাচর পাওয়া যায় না। এমন জনশূন্য দেখার জায়গা আমাদের দেশে খুব বেশি নেই। মানজিৎ বলল, ভারতীয় পর্যটকেরা জঙ্গল দেখে ফেরত চলে যায়, গড় দেখতে আসে শুধু বিদেশিরা।

গোটা পাহাড় জুড়ে বরাহ অবতার

বিদেশিরা? তারা কি শেষশয্যার মানে বুঝবে? ওই সব অবতারেরই বা কী মানে করবে তারা? এত সুন্দর একটা গড়, আমাদের একেবারে নিজস্ব জিনিস দেখতে জানতে বুঝতে ইচ্ছে করে না? পাহাড়ি রাস্তা ধরে টুকটুক করে ওপরে উঠে যাওয়ার মধ্যেও তো আনন্দ আছে, তাও কি উপভোগ করতে ইচ্ছে করে না? বান্ধবগড়ের মতো নিদর্শনের প্রতি আমাদের উৎসাহ না থাকলে দরদ মমতা যত্ন কোথা থেকে আসবে। ভবিষ্যতের মানুষের জন্য যেমন জঙ্গল পশুপাখি তেমন এই সব ঐতিহাসিক আর ধর্মীয় নিদর্শনগুলো বাচিয়ে রাখতে হবে বৈকি। অন্তত এইটুকু করলেও অনেকটা করা হবে।

সুভদ্রা ঊর্মিলা মজুমদার
সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩০ মার্চ ২০০৫

Sending
User Review
0 (0 votes)

Add Comment