জলরঙে আঁকা সোনামোড়ল হাওর

সূর্যডোবা পথ। বড়াই নদীর ধারে চুপচাপ বসে আছে এক কানিবক। সবুজ ঘাসের চাদরে ছেয়ে আছে সে নদীর দুই কূল। কোনো ভাঙনের চিহ্ন নেই। এক দিক তার চলে গেছে মেঘালয়ের দিকে। বিকেলের দিকেই নদীটিতে ছিল বৃষ্টির জলের রূপময় ফোঁটা। একঝাঁক দেশি হাঁস জলকেলিতে মেতেছিল তখন।
সকাল থেকে নদীই একমাত্র চলার পথ। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থেকে ট্রলারে করে এলাম ধর্মপাশা। সেখান থেকে নৌকায় সোনামোড়ল। প্রথমে সুরমা তারপর বাউলাই নদী হয়ে ধর্মপাশার সুখাইর বাজার নামার আগেই জেনেছি, এটাই সোনামোড়ল হাওর। দেখে মনে হলো জলরঙে আঁকা ছবি। করচগাছের শৈল্পিক পাতার বিন্যাস, শীতল ছায়া ভাবনায় ফেলে দেয় মনকে।
হাওরে জমিদারবাড়ি থাকে? সোনামোড়লের সুখাইর গ্রামে আছে এক বিধ্বস্তপ্রায় জমিদারবাড়ি। সুখাইর জমিদারবাড়ির শেষ বংশধর হিসেবে সে বাড়িতে থাকেন জমিদারের কয়েকজন দৌহিত্র। সুখাইর এলাকাবাসীর কাছে জানা গেল, এখানে একটি বড় হিজল-করচের বাগান আছে। নাম কাট্টগোড়াবাগ। হাওরবাসী বনকে বাগ বলে। হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম কাট্টগোড়াবাগের কাছে। প্রায় ২০০ একর জায়গাজুড়ে এ বনের বেশির ভাগ গাছই হিজল। করচের সংখ্যা কম। কারণ করচ ইতিমধ্যে কাটা হয়ে গেছে।
এক লোক জানালেন, তাঁদের দাদার আমলে এ বনে বাঘ থাকত। এখন নেই। বনের পাশের একটি লম্বা জলাশয়ের কাছে দেখা মিলল দেশি মেটে হাঁস, পাতিমুরগি, শামুকখোলা পাখির। বনের পাশ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কালাপানি গাঙ বা কাউনাই নদীর দিকে যেতেই চোখে পড়ল এক পাখি। ছেলেবেলা থেকেই কানিবক দেখে আসছি, কিন্তু এ রঙের আর দেখিনি। পাখিটি ছিল বিপন্ন চায়নিজ পন্ড হেরন বা চীনা কানিবক। পরিযায়ী এ বকটি দেখতে আমাদের চিরচেনা কানিবকের মতো, কিন্তু মাথা, ঘাড় ও বুকের কাছের পালক গাঢ় মেরুন। উড়লে সে রং দেখা যাবে না, কেবল বসলেই দেখা যায়। কাউনাই নদীটির মাঝখানটায় জলজ আগাছা জন্মে দ্বীপের মতো একটি আকার ধারণ করেছে। হঠাৎ সেখানে উড়ে এল একটি কুড়া ইগল। লেজের রিংটি ভালোভাবেই দেখা গেল এবার।
দুপুরের শেষভাগ। আকাশে কালো মেঘ জমেছে। বৃষ্টি আসবেই। আশপাশে কোনো বাড়িঘর নেই। দূরে একটি গ্রাম দেখা যাচ্ছে। আমরা কজন হাঁটতে শুরু করি। সবুজ ধানক্ষেতের আইল ধরে প্রায় তিন কিলোমিটার হেঁটে বড়াই নদী পার হয়ে আমরা পৌঁছাই জয়শ্রী বাজারে। যখন বৃষ্টি নামল তখন নদীর কূলে ভেড়ানো একটি নৌকার ভেতর আশ্রয় নিই। এক নাম না-জানা কিশোরী দেবদূতের মতো এসে নৌকাটির দরজা খুলে দিয়েছিল, না হলে ভিজে জবুথবু হয়ে যেতে হতো, সঙ্গে শিলার আঘাত তো ছিলই।
ভাগ্যক্রমে সেই নৌকাটিতেই এবার যাত্রা। ভাড়া করার পর মাঝিকে বৃষ্টিভেজার গল্পটা শুনিয়ে দিলাম। এবারের গন্তব্য জামালগঞ্জের গোলকপুর বাজার। বৃষ্টির পর প্রকৃতি অফুরন্তভাবে আকর্ষণ করে। এখানের করচের ভেজা পাতা, ঠান্ডা বাতাসের শিহরণ, পাখিদের ডানার জল ঝাড়ার দৃশ্য কখনোই ভোলার নয়। বড়াই নদী দেখতে দেখতে একসময় চানপুরার বাগে এসে চোখে পড়ল হাজার খানেক শামুকখোলা পাখির। বরুণগাছে গাদাগাদি করে বসা ছিল পাখিগুলো। চানপুরার পর দৌলতপুর এসে শেষবার দেখা মিলল দুটি কুড়া ইগলের। ছোট্ট এক করচগাছের শাখায় বসে ছিল পাখি দুটি বিকেলের শেষভাগে। সন্ধ্যা নামল। সোনামোড়ল ছেড়ে চলে যাচ্ছি। পাখি দুটি শেষ সীমানায় এসেই বিদায় জানাল। কিছুক্ষণ পর আবার সুরমায় গিয়ে পড়লাম। সোনামোড়ল হাওর চোখ থেকে দূরে চলে গেল। নতুন এক সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় রইল পাখি দুটি।

সৌরভ মাহমুদ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুলাই ০৭, ২০০৯

Sending
User Review
0 (0 votes)

Add Comment