গেনতিং হাইল্যান্ডে হাতের কাছে মেঘ মালয়েশিয়ার কেডা প্রদেশের একটি জেলা লঙ্কাউই। লঙ্কাউইয়ে নেমে প্রথমে গেলাম মাশুরি জাদুঘরে। ঢুকেই দেখা হলো ছোট একটা তথ্যচিত্র। ১৯ শতকের শুরুর দিকে লঙ্কাউইয়ে মাশুরির জন্ম। লঙ্কাউইয়ের শাসকের ছেলের সঙ্গে রূপবতী মাশুরির বিয়ে হয়ে গেল। কোলজুড়ে এল ফুটফুটে এক শিশু। সুখের আর শেষ নেই ওর। এই সুখই হয়ে উঠল অন্যের চোখের কাঁটা। তখন মাশুরির স্বামী কাছে নেই। মাশুরির বিরুদ্ধে অন্য পুরুষের সঙ্গে ব্যভিচারের অভিযোগ আনা হয়। মিথ্যে অভিযোগে মাশুরির দণ্ডাদেশ ঘোষিত হলো। তার শ্বশুর স্বয়ং এই দণ্ড ঘোষণা করলেন। মৃত্যুদণ্ড। তার ব্যথিত চোখ দর্শককে করুণায় বিগলিত করে। মাশুরিকে এক বিজন জায়গায় নিয়ে হত্যা করা হয়।
মৃত্যুর আগে মাশুরি লঙ্কাউই দ্বীপকে একটা অভিশাপ দিয়ে যায়। কেউ বলে সেই অভিশাপ ছিল, পরবর্তী সাত প্রজন্ম ধরে লঙ্কাউই দ্বীপে শান্তি থাকবে না; কেউ বলে, অভিশাপটি ছিল আগামী সাত প্রজন্ম লঙ্কাউই বন্ধ্যা থেকে যাবে। ঘটনা হলো, লঙ্কাউইয়ের উন্নতি খুব বেশি দিনের ঘটনা নয়, এবং এর মধ্যে সাত প্রজন্ম পেরিয়েও গেছে। লঙ্কাউই দেখে অভিভূত হতে হয়।
২৪ মে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে লঙ্কাউই গেলাম মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসে। রোদ ঝলমল দুপুরে যেতে যেতে দেখছি, রাস্তার দুপাশে কোথাও বিস্তৃত ভূমি, ধানখেত, কোথাও দূরে পাহাড়, পাহাড়ের চূড়ায় দলবদ্ধ মেঘের আনাগোনা। গাইড বদরুল বলছিলেন, লঙ্কাউইয়ে রোদ-বৃষ্টি একেবারেই অনিশ্চিত। কয়েক কিলোমিটার যেতেই রোদের ওপরই শুরু হলো মুষলধারায় বৃষ্টি। ওই বৃষ্টির মধ্যেই আমরা মাশুরি বৃত্তান্ত জানলাম। মাশুরি যেন আমাদেরই মেয়ে। মনটা হাহাকার করে উঠল। মাশুরি কমপ্লেক্সে ঘুরে ঘুরে দেখলাম পুরোনো ধরনের বাড়ি, মাশুরির কবর, একটা কুয়ো। এই কুয়োর পানি ব্যবহার করা হয়, কিন্তু কখনো কমে না। জাদুঘরে রাখা হয়েছে মাশুরির নানা স্মৃতিচিহ্ন। তার সুটকেস, ব্যবহার্য জিনিসপত্র। কাচঘেরা দেয়ালের ভেতর সবচেয়ে বেশি ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করে একটি ছুরি। এই ছুরি দিয়েই মাশুরিকে হত্যা করা হয়।
ভারী মন নিয়ে বেরিয়ে এলাম। রাস্তার দুপাশটা বাংলাদেশের মতোই। নারকেল, সেগুন আর তেঁতুলগাছে ভরা। আমাদের মতো ওরাও বেশ মেহগনি লাগিয়েছে। বদরুল আমাদের নিয়ে গেলেন আন্ডার ওয়াটার ওয়ার্ল্ড দেখাতে। বেশ বড় জায়গা নিয়ে পর্যটকদের দেখার জন্য জ্যান্ত মাছের এই জগৎটা তৈরি করা হয়েছে। নানা আকৃতির মাছগুলো শুধু মনই মাতাবে না, চাইলে সমুদ্রের বেশ কিছু মাছ সম্পর্কে আপনি পণ্ডিত হয়ে উঠতে পারবেন। এর সঙ্গে আছে সাপ, গিরগিটি, পেঙ্গুইন—এমনকি সাদাকালো লেজওয়ালা এক পেঁচামুখো বানরও চোখে পড়ল।
আমাদের থাকার ব্যবস্থা ‘মেরিটাস পেলাঙ্গি বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা’য়। পাঁচতারা হোটেল, কিন্তু সুউচ্চ কোনো ভবন নেই। সমুদ্রের তীরে বিরাট জায়গা নিয়ে এই রিসোর্ট। সব কাঠের বাড়ি। একটাতে চারটি রুম। রিসোর্ট এলাকায় চলার জন্য আছে বিশেষ ধরনের গাড়ি। ব্যাগপত্র নিয়ে একটি গাড়িতে উঠলাম। হোটেলের দুজন মেয়েকর্মী ঘুরিয়ে দেখাল তাদের আয়োজন। সুইমিং পুল, নানা ধরনের গাছ, পাখির কাকলি আর প্রান্তে সমুদ্রের নীল জলরাশি আর ভেসে আসা বাতাসের গুঞ্জন।
বিকেলে গাড়ি নিয়ে গেলাম ওরিয়েন্টাল ভিলেজে। ওখান থেকে চাপলাম কেব্ল কারে। গেনতিং হাইল্যান্ডেও কেব্ল কারে চড়েছি। সে এক চমৎকার অভিজ্ঞতা। গেনতিংয়ে গেছি ২২ মে। কুয়ালালামপুর থেকে মাইক্রোবাসে এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট লাগে। পাহাড়ের ওপর একটা পর্যটনকেন্দ্র। প্রথমে একটা কেব্ল কার স্টেশন। সেখান থেকে মূল কেন্দ্রে গেছি কেব্ল কারে। উচ্চতা সমুদ্রপিঠ থেকে ৬১১৮ ফুট। একই সঙ্গে লাগোয়া পাঁচটি হোটেলের একটি ফার্স্ট ওয়ার্ল্ভ্র হোটেল, এর রুমের সংখ্যাও ছয় হাজার ১১৮টি। আমাদের মতো মানুষের জন্য গেনতিং ভালো বিনোদনকেন্দ্র। মালয়েশিয়ার একমাত্র ক্যাসিনো এই গেনতিংয়েই। কিন্তু এখানে চমৎকার আয়োজন রয়েছে শিশুদের জন্য। রয়েছে থিম পার্ক। বাচ্চাদের জন্য এমন সব রাইড, উঠব ভাবলেই পিলে চমকে যায়। ট্রেন যেন চলছে আকাশের মধ্যে যেন। যেকোনো শিশু এখানে এসে অভিভূত হবে।
গেনতিংয়ের আগে আমরা সে দেশের প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ার সৌন্দর্য দেখে এসেছি। ঘুরে এসেছি কুয়ালালামপুরের অদূরে বিখ্যাত রয়্যাল সিলাঙ্গর ভিজিটিং সেন্টার। প্রাকৃতিক গুহার মধ্যে বাটু কেইভস হিন্দু টেম্পলে উঠেছি ২৭২টি সিঁড়ি ভেঙে। উঠেছি সবচেয়ে উঁচু কুয়ালালামপুর টাওয়ারে।
গেনতিংয়ের চেয়ে লঙ্কাউইয়ের কেব্ল কার পাঁচকাঠি সরেস। সেটা আমাদের অবিশ্বাস্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দীর্ঘ সে যাত্রায় একটামাত্র বাঁক, আর একটামাত্র পিলার। কেব্ল কারে যেতে যেতে সুউচ্চ পাহাড় দেখি, গায়ের কাছে মেঘ। বদরুল বললেন, একতারের ওপর এটা পৃথিবীর দীর্ঘতম কেব্ল কার লাইন। কেব্ল কার আমাদের যে স্টেশনে নিয়ে গেছে, সেখানে দুই পাহাড়ের চূড়ায় একটা অর্ধবৃত্ত স্কাই ব্রিজ। কীভাবে ৭০০ মিটারের বেশি উচ্চতায় এই ব্রিজ বানিয়েছে আল্লাহ মালুম। ৭০০ মিটার নিচে থেকে একটা টাওয়ারে উঠে এক দানবিক শক্তিতে ব্রিজটাকে ধরে রেখেছে। সেই ব্রিজ থেকে বদরুল আমাদের নানাদিকে হাত তুলে দেখান—ওদিকে আন্দামান সাগর, এদিকে থাইল্যান্ড ইত্যাদি। আমাদের নিচে সাগর। সাগরে বেশ কিছু ছোটবড় দ্বীপ। লঙ্কাউইতে এ রকম দ্বীপ রয়েছে ৯৯টি। এই পাহাড়গুলো আসলে লাইমস্টোন। সেই পাহারের গায়েও নানা তরু। চোখ জুড়িয়ে যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা সমুদ্রের মধ্যে সূর্যাস্ত দেখি।
রাতে সমুদ্রের তীরে খোলা জায়গায় খেতে বসেছি। পাতে দুটো ঝিনুক নিয়ে বেশ উত্তেজিত আমি। কী সুন্দর একটা রাত। দূরে দ্বীপের ছায়া। হঠাৎ বৃষ্টি। পড়িমরি করে ছুটলাম রেস্তোরাঁর ভেতর। সেখানে আলো-আঁধারির মধ্যে স্কার্ট পরা এক তরুণীশিল্পী শুরু করল গান। মিষ্টি গলা। সেই গানের রেশ নিয়ে আমরা আমাদের কাঠের ঘরে ফিরে যাই।
পরদিন ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট দেখতে গিয়ে শুরু করলাম ব্যাট কেইভ দিয়ে। এটা বাদুড়ের গুহা। ঢুকে টর্চ জ্বেলে বদরুল দেখালেন শত শত বাদুড়। এরপর বোটে চড়ে এগোচ্ছি। দুপাশে চোখে পড়ছে ছোটবড় বানর। খাল বেয়ে বেশ কিছুদূর গেলে ঈগল এলাকা। শত শত ঈগল বসে আছে ছোট নদীর দুপাশে গাছের মাথায়। বদরুল খাবার ছিটিয়েছেন কিছু। ঈগলগুলো পাক খেয়ে নেমে আসছে, সাঁই করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে খাবার। বদরুল বললেন, সংস্কৃত ‘লং’ মানে ঈগল আর ‘কাউই’ মানে ব্রাউন—ব্রাউন ঈগল—লঙ্কাউই। এই ফরেস্টের সঙ্গে সুন্দরবনের তফাত হলো, এখানে পাহাড় আছে, সেগুলো নদীর জল ভেদ করে হঠাৎ হঠাৎ উঠে গেছে।
বিকেলে বেশ কিছুক্ষণ গাড়ি চেপে একটা জেটিতে এলাম। একটা বোট আমাদের বহির্নোঙ্গরে একটি ক্রুজ শিপে নিয়ে গেল। নাম ‘সেরেনিটি লিলি মারলিন’। রুমে গিয়ে বুঝলাম, এও একটা চার-পাঁচ তারা হোটেলের মতো। বেলা চারটায় বোটে চেপে একটা ইয়টে গেলাম। পুরো ইয়টে এক বয়স্ক অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি, ক্যাপ্টেন, দুজন ক্রু আর আমরা পাঁচজন। ক্রুদের সঙ্গে খুব খাতির হয়ে গেল। আমরা গিয়ে পড়লাম বিখ্যাত মালাক্কা প্রণালিতে। প্রায় তিন ঘণ্টা ঘুরলাম সমুদ্রে, ডানে-বামে বেশ কিছু সবুজ পাহাড়-দ্বীপ পেরিয়ে। লঙ্কাউইয়ের ৯৯টি দ্বীপের বেশ কয়েকটি দেখা হলো এখানে। এই জায়গা যে কাউকে বিস্ময়ে হতবাক করে দেবে। ইয়টে বসে অতিদূর সমুদ্রের মধ্যে যখন সূর্যাস্ত দেখছি, আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না আমি ইয়টে বসে আছি। ইয়টে পোড়া মাছ-মাংস দিয়ে রাতের খাবার খেলাম।
মালয়েশিয়া পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘ট্যুরিজম মালয়েশিয়া’র আমন্ত্রণে ২১টি দেশের সাংবাদিক কুয়ালালামপুরে যাই। আমাদের যাওয়া-আসা স্পন্সর করেছে মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস। গত ২০ মে বিকেলে কুয়ালালামপুরে রেনেসাঁস হোটেলের বলরুমে মালয়েশিয়ার যোগাযোগ এবং প্রচারণা বিভাগের পরিচালক আমাদের স্বাগত জানান। মালয়েশিয়ার একজন সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ মালয়েশিয়ার সংস্কৃতি সম্পর্কে বললেন চমৎকার করে। দ্বিতীয় পর্বে ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক আমাদের হাতে সনদ তুলে দেন। আমরা একটা তথ্যচিত্র দেখি। সঙ্গে শুনি অপূর্ব এক গান। গানটি বলতে চেয়েছে, মালয়েশিয়া হচ্ছে এশিয়ার আত্মা।
পরদিন বিকেলে ছিল সবচেয়ে মনোজ্ঞ আয়োজন ‘চিত্রবর্ণা’, ওরা বলে ‘চিত্রওয়ার্না’—কালার অব ওয়ান মালয়েশিয়া। মালয়, চীনা, ইন্ডিয়ান ও অন্যান্য আদিবাসী জনজাতির মোট পাঁচ হাজার শিল্পী নানাভাবে নেচে তাঁদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন। এই মহানৃত্যানুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং রাজা-রানি, উপপ্রধানমন্ত্রী, পর্যটনমন্ত্রীসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তরা। মালয়েশিয়ায় ট্যুরিজমকে উৎসাহিত করার জন্য এত আয়োজন। তারা আমাদের বোঝাতে চেয়েছে মালয়েশিয়ায় অনেক ধর্ম, অনেক জাতি, অনেক ভাষা, অনেক সংস্কৃতি। এসবই একটি মালয়েশিয়াকে নির্দেশ করছে। তোমরা আসো, দেখে যাও। দেখার জন্য আমরা কুয়ালালামপুর থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

জাফর আহমদ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুন ০৭, ২০১১