ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা মানিকগঞ্জ। এর উত্তরে টাঙ্গাইল জেলা, দক্ষিণে ফরিদপুর ও ঢাকা জেলা, পূর্বে ঢাকা জেলা এবং পশ্চিমে পাবনা ও রাজবাড়ী জেলা অবস্থিত। পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী, ইছামতি, কালিগঙ্গা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ নদী এ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে বেড়ানোর তথ্য নিয়ে কড়চার এবারের বেড়ানো। লিখেছেন ও ছবি তুলেছেন মুস্তাফিজ মামুন

বালিয়াটি জমিদার বাড়ি

সুরম্য এ জমিদার বাড়িটি জেলার সাঁটুরিয়ায় অবস্থিত। বালিয়াটির জমিদাররা আঠারো শতকের প্রথম ভাগ থেকে বিশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত প্রায় দু’শ বছর নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তৈরি করেন। আঠারো শতকের মধ্যভাগে জনৈক লবণ ব্যবসায়ী জমিদার গোবিন্দরাম শাহ বালিয়াটি জমিদারবাড়ি নির্মাণ করেন। আর ক্রমান্বয়ে তার উত্তরাধিকারীরা এখানে নির্মাণ করেন আরো বেশ কটি স্থাপনা। এখানে পূর্ববাড়ি, পশ্চিমবাড়ি, উত্তরবাড়ি, মধ্যবাড়ি এবং গোলাবড়ি নামে পাঁচটি ভবন ছিল। আর জমিদারবাড়ির এ বিভিন্ন অংশ বালিয়াটি জমিদার পরিবারের বিভিন্ন উত্তরাধিকারী কর্তৃক তৈরি হয়েছিল। মূল প্রসাদ কমপ্লেক্সটি একই রকম পাঁচটি অংশ পৃথকভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে পূর্বের অংশটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলেও বাকি চারটি টিকে আছে এখনও। মূল ভবনগুলোর সম্মুখভাগে নানারকম কারুকাজ আজ মূর্তি এখনও বিদ্যমান।

বালিয়াটি জমিদারবাড়ির বিশাল কমপ্লেক্সটি উঁচু দেয়ালে চারদিক ঘেরা। এখনও টিকে রয়েছে সেই দেয়াল। এ দেয়ালের মাঝে এখন রয়েছে চারটি সুদৃশ্য ভবন। আর ভবনগুলোর সামনের বেষ্টনী দেয়ালে রয়েছে চারটি প্রবেশ পথ। চারটি ভবনের পেছন দিকে রয়েছে আরো চারটি ভবন। চারটি প্রবেশ পথের চূড়ায় রয়েছে পাথরের তৈরি চারটি সিংহমূর্তি।

রাম কৃষ্ণ মিশন

বালিয়াটি জমিদার বাড়ির পাশেই রয়েছে রাম কৃষ্ণ মিশন। ১৯১০ সালে বালিয়াটিতে শ্রী রাধিকা চরণ চৌধুরি রাম কৃষ্ণ মিশন দেবাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। এ দেবাশ্রমে একটি উপসনালয় এবং একটি গ্রন্থাগার আছে। ভারতের কেন্দ্রীয় রাম কৃষ্ণ মিশন কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বাংলাদেশের দশটি মিশনের মধ্যে এটি অন্যতম একটি ।

গৌরাঙ্গ মঠ

রামকৃষ্ণ মিশনের সামনে রয়েছে বিখ্যাত গৌরাঙ্গ মঠ। জমিদার মনমোহন রায় চৌধুরি ১৯২৫ সালে তার সহধর্মিনী ইন্দুবালা এবং কন্যা সুনীতিবালার স্মৃতির উদ্যেশ্যে ভারতের বিখ্যাত গদাই গৌরাঙ্গ মঠের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এ শাখা মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। মঠটির ভেতরে গদাই গৌরাঙ্গ মূর্তিটি এখন আর মন্দিরে নেই। ৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পাক হানাদার বাহিনী পাথরের তৈরি মূর্তিটি ধ্বংস করে ফেলে।

ঈশ্বরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়

বালিয়াটি জমিদার বাড়ির কাছেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হলো ঈশ্বরচন্দ্র উচ্চ বিদাালয়। বালিয়াটির অন্যতম জমিদার ঈশ্বরচন্দ্র রায়ের নামানুসারে এ স্কুলের নামকরণ করা হয়েছে। ১৯১৫-১৬ সালে ঈশ্বরচন্দ্রের পুত্র হরেন্দ্র কমুার রায় চৌধুরী স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। হরেন্দ্র কুমার তৎকালীন সময়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা ব্যয় করে স্কুলটির পাকা ভবন নির্মাণ করেছিলেন।

তেওতা জমিদার বাড়ি

জেলার শিবালয় উপজেলায় অবস্থিত প্রাচীন জমিদার বাড়ি। বাবু হেমশংকর রায় চৌধুরী এবং জয়শংকর রায় চৌধুরী নামে দুই জমিদার ভাই সুরম্য এ বাড়িটিতে থেকে জমদিারি পরিচালনা করতেন। বর্তমানে এটি ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। ভগ্নপ্রায় ৫৫ টি কক্ষ এখনও এ বাড়িটিতে অবশিষ্ট আছে।

শ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ি

মানিকগঞ্জ শহরে অবস্থিত ১৮৯৫-৯৬ সালে নির্মিত শ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ি। এ মন্দিরে শ্রী আনন্দময়ী কালী মায়ের প্রস্তর মূর্তি আছে। প্রতি বছর রথ উপলক্ষে এখানে লোকজ মেলা বসে। এছাড়া এখানে নিয়মিত ধর্মসভা, নামকীর্তন, যাত্রাপালাসহ নানা অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।

মাচাইন মসজিদ ও মাজার

সুলতানি আমলের প্রাচীন একটি স্থাপনা মাচাইন মসজিদ। এটি জেলার মাচাইন গ্রামের নামে এর নামকরণ হয়েছে। জনশ্রুতি আছে এখানে শাহ রুস্তুম নামে একজন দরবেশ বাঁশের মাচায় বসে ধ্যান মগ্ন থাকতেন। মসজিদের পাশেই এ দরবেশের মাজার অবস্থিত।

আরিচা ঘাট ও যমুনা

মানিকগঞ্জের একসময়ের ব্যস্ত জনপদ আরিচা ঘাট। ফেরি ঘাট অন্যত্র স্থানান্তরের কারণে এখন এর ব্যস্ততা অনেক কমে এসেছে। এ জায়গা থেকে যমুনার সৌন্দর্যও বেশ সুন্দর। এখানে যমুনার চরে নৌ ভ্রমণও বেশ আনন্দদায়ক।

কীভাবে যাবেন

ঢাকার গুলিস্তান থেকে শুভযাত্রা, বিআরটিসি পরিবহন, গাবতলী থেকে যাত্রীসেবা, পদ্মা লাইন, নবীন বরণ, ভিলেজ লাইন, জনসেবা পরিবহন, বাবু বাজার থেকে ছালছাাবিল, শুকতারা পরিবহনে চড়ে যাওয়া যায় মানিকগঞ্জ সদরে। ভাড়া ৪০-৫০ টাকা। ঢাকা থেকে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি ও এর আশপাশের জায়গাগুলো দেখার জন্য এসব বাসে চড়ে কালামপুর নেমে সেখান থেকে লোকাল বাসে সাঁটুরিয়া আসা যায়। মানিকগঞ্জ শহর থেকেও সাঁটুরিয়ার বাস আছে। ভাড়া ১৫ টাকা।

কোথায় থাকবেন

ঢাকা থেকে দিনে দিনেই বেরিয়ে আসা যায় মানিকগঞ্জ। আর থাকার জন্য ভালো মানের কোন হোটেলও নেই এখানে। একান্ত জরুরি থাকতে হলে সাধারণ মানের দু’একটি হোটেলের ঠিকানা হেয়া হলো। শহরের শহীদ রফিক সড়কে হোটেল, মানিকগঞ্জ আবাসিক বোর্ডিং, ফোন- ০৬৫১-৬১৩৫৯। মানিকগঞ্জ বাস স্টেশনে হোটেল নবীন, ফোন- ০১৭১২৬১১৪৫২। এসব হোটেলের প্রতিদিনের ভাড়া এক শয্যার কক্ষ ৫০-১০০ টাকা, দ্বি-শয্যার কক্ষ ১০০-১৫০ টাকা।

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, মে ০৪, ২০১০