স্বচ্ছ পানির লেকের পাড় দিয়ে সারি সারি ফুলের গাছ। এর মধ্য দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে রাস্তা। মূল ফটক ধরে একটু সামনে এগিয়ে গেলেই অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন এক সৈনিক। খাপ থেকে তলোয়ার বের করতে দেখেও কোনো ভয়টয় জাগল না। প্রাণহীন মূর্তি ইতিহাস নিয়ে শুধু আগ্রহটা বাড়াতে জানে, আতঙ্ক জন্মানোর দায়িত্ব তাঁর নয়।

অতন্দ্র প্রহরীকে পেরিয়ে একটু দূরে গোলাকার বেদিতে আকাশের ঠিকানায় দাঁড়িয়ে আছে পতাকাদণ্ড। যার সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় পতপত করে উড়ছে একটি পতাকা। তাজিকিস্তানের বিশাল সে পতাকা দেখেই মনে প্রশ্ন জাগে, পতাকা, তুমি কত বড়। দাঁড়িয়ে আছ কত উঁচুতে?

২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবেতে অবস্থিত এই জায়গাটির সরকারি নাম দুশানবে ফ্ল্যাগ পোল। পতাকাটি এত উঁচুতে উড়ছে যে দুশানবের যেকোনো জায়গা থেকে যা চোখে পড়বে। ইতিমধ্যেই এটি জায়গা করে নিয়েছে গিনেস রেকর্ড বুকে।

একটি পতাকা একটি জাতির পরিচয়, গর্ব ও অহংকার। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন পতাকা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। লাল-সবুজ দেখলেই বাঙালি জাতির মাথা নুয়ে আসে। রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন না করলেও জাতীয় পতাকার গুরুত্বটা তাজিকিস্তানের কাছে আর সব দেশের মতোই। তাই তেরঙা পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে আকাশের ঠিকানায়।

উচ্চতাটা কত জানেন? ১৬৫ মিটার বা ৫৪১ ফুট। পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পতাকা। তবে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তাজিকদের ফ্লাগ পোলই ছিল উচ্চতার শীর্ষে। তাদের শ্রেষ্ঠত্বের আসন কেড়ে নিয়েছে জেদ্দা ফ্ল্যাগ পোল। সৌদি আরবের পতাকা এখন উড়ছে ১৭০ মিটার বা ৫৬০ ফুট উচ্চতায়।
দুশানবের ফ্ল্যাগ পোলে পা রাখলে একটি বিষয় পরিষ্কার, স্থানীয় জনগণ জায়গাটি খুব ভালোবাসে। লেকের পাড়ে মার্বেলের মেঝেতে শুয়ে-বসে রোদ পোহান বয়স্ক মানুষেরা। পর্যটকেরা ঢুঁ মারেন বলে আছে ক্যামেরামানদের দৌরাত্ম্য। সবচেয়ে মজার বিষয়, সাভারের স্মৃতিসৌধের মতো এখানে এসেও স্কুল ফাঁকি দেয় কিশোর-কিশোরীরা। না জানি কত উঠতি প্রেমের গল্পের সাক্ষী হয়ে থাকে এই ফ্ল্যাগ পোলের পাখিরা।

স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী আজম ওলভিক গর্ব করে বলেন, ‘আমাদের দেশের পতাকা এত উঁচুতে উড়ছে দেখতে ভালো লাগে, গর্ব হয়।’ তবে ভিন্নমতও আছে। কর্মস্থল জানাতে অনিচ্ছুক ফুরকাতের অনুযোগ, ‘এই ফ্ল্যাগ পোল নিয়ে গর্ব করি না। কারণ পতাকা অনেক উঁচুতে উড়লেও আমাদের জীবনযাত্রার মান তো তার ধারেকাছেও নেই। জেদ্দা ফ্ল্যাগ পোল যেমন অনেক উঁচুতে, ঠিক তেমনি তাদের জীবনযাত্রার মানও অনেক উঁচুতে।’ ফুরকাতের যুক্তি ফেলনার নয়। কবিগুরু তো কবেই বলে গেছেন, ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি।’

দুশানবেতে ঘুরতে এসে অবশ্য যুক্তিতর্কের ধার ধারছি না। হয়তো দুশানবের এই ফ্ল্যাগ পোলের গল্প থেকেই ঢাকার আকাশেও অনেক উচ্চতায় উড়বে বাংলাদেশের পতাকা।

রাশেদুল ইসলাম, তাজিকিস্তান থেকে
সোর্স – প্রথম আলো।