কোনার্কের সূর্য মন্দির – বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই কাদার অস্থায়ী দেয়া‌লের ওপর তু‌লে একটার ওপর একটা সা‌জি‌য়ে বানা‌নো হ‌য়ে‌ছে এ ম‌ন্দির। ছবি: গোলাম মর্তুজা

ওডিশায় এসে কোনা‌র্কের সূর্য ম‌ন্দিরটা না দে‌খে ফি‌রে যাওয়‌াটা যে নেহাত বোকামি তা ক‌য়েকবারই বল‌লেন গা‌ড়িচালক হ‌রি। হ‌রির কথা যে ক‌তেখা‌নি সত্য তা ম‌ন্দির দর্শ‌নের আগে বুঝ‌তে পা‌রি‌নি।

‌৯ সে‌প্টেম্বর হ‌রির গা‌ড়ি‌তেই সওয়ার হলাম। আমা‌দের ম‌ন্দিরের গে‌টে না‌মি‌য়ে দি‌য়েই হ‌রি চম্পট দিল। ম‌ন্দি‌রে ঢোকার মু‌খেই গাইডের দল ছে‌কে ধর‌ল। রী‌তিম‌তো টানাটা‌নি অবস্থা। ম‌নে ম‌নে ভাবলাম কি‌সের গাইড! গুগল মেরেই চা‌লি‌য়ে নে‌ব। গুগল কর‌তে গি‌য়েই তো মাথা খারাপ। পাত‌ার পর পাতা আস‌ছে। সূর্য ঘ‌ড়ির দিন, মাস, বছর নি‌য়ে দীর্ঘ লেখা। কামকলার একেকটা ছ‌বি আর যৌনতা নি‌য়ে দীর্ঘ বি‌শ্লেষণ।

সূর্য ম‌ন্দি‌রে যৌনতা কো‌ত্থে‌কে এল এসব ভাব‌তে ভাব‌তেই মাথাটাথা খারাপ ক‌রে ভেত‌রে টি‌কিট ঘ‌রের সাম‌নে লাইনে দাঁড়ালাম। দে‌খি হে‌লেদু‌লে সাম‌নে এসে হা‌জির এক বু‌ড়ো। জানা‌লেন তি‌নি এখানকার গাইড, আমরা রাজি থাক‌লে তি‌নি আমা‌দের সঙ্গ দি‌তে চান। আমার বউ ম‌রিয়ম জি‌জ্ঞেস কর‌ল আপ‌নি বাংলা জা‌নেন। বু‌কে আঙুল দি‌য়ে গাইড‌ বু‌ড়ো বল‌লেন, ‘হা‌মি জো‌ম্বেশ্বর পান্ডা আছি মেডাম, পাচপান সাল ইখা‌নে গাইড‌গি‌রি কর‌ছি। হাম‌কো ভারাতের সব ভাষাই মালুম আছে।’ গাইডবাবুর বাংলা শু‌নে ভড়‌কে গেলাম দুজনই। তবুও কথা যে‌হেতু বোঝা যায়, প‌ান্ডাজির নেতৃ‌ত্বেই আমা‌দের কোনার্ক দর্শন শুরু হ‌লো।

‌আমা‌দের কান্তাজিউ ম‌ন্দি‌রে যেমন টেরা‌কোট‌ার চিত্র এখা‌নে চিত্রগু‌লো শক্ত পাথরে খোদাই ক‌রে তোলা হ‌য়ে‌ছে। আর ছ‌বিগু‌লোর বে‌শির ভাগই কামের নানা ভঙ্গিমার।

কোনার্ক ম‌ন্দিরটা আস‌লে কী জ‌ন্য বে‌শি বিখ্যাত? সূর্য ঘ‌ড়ি, গা‌ণি‌তিক হিসাব না এর গা‌য়ে উৎকীর্ণ কামকলার ছ‌বিগু‌লোর জন্য? ত‌বে যেটাই হোক একবার গে‌লে তো কো‌নো কিছু না দে‌খে তো আর ফেরা যায় না! গ‌ণিত, বিজ্ঞান, ভ‌ক্তি আর চিত্রকলার এক অপূর্ব মিশ্রণ এ ম‌ন্দির।

কাম, যৌনতা এসব নি‌য়ে যে আমা‌দের ঢাক ঢাক গুড় গুড় আছে, সেটা গাইড পান্ডা বাবু ভা‌লোই জা‌নেন। আমা‌কে আর আমার বউকে বাবা-মা ডে‌কেটে‌কে বল‌লেন, ক‌লি‌ঙ্গের যু‌দ্ধে প্রচুর মানুষের মৃত্যুর পর নাকি লোকজন বিবা‌গি হ‌তে শুরু ক‌রে। তখন তাদের সংসারে মন বসা‌তে, সন্তান জন্মদা‌নে উৎসা‌হিত কর‌তে ম‌ন্দি‌রের গা‌য়ে এসব কামকলার চিত্র খোদাই করার কাজ শুরু হয়। মুচ‌কি হে‌সে র‌সিক পান্ডা বল‌লেন, সেই থে‌কে ভারতীয়রা এত বে‌শি উৎসাহ পে‌য়ে‌ছে যে এখন আর থাম‌ছেই না।

টেরা‌কোট‌ার চিত্রগু‌লো শক্ত পাথরে খোদাই ক‌রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছবি: গোলাম মর্তুজা 

টেরা‌কোট‌ার চিত্রগু‌লো শক্ত পাথরে খোদাই ক‌রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছবি: গোলাম মর্তুজা

ম‌ন্দির‌টি পুবমু‌খী, যা‌তে সূ‌র্যের প্রথম কিরণটা ভেত‌রে পড়ে। য‌দিও এখন আর ভেত‌রে যাওয়া যায় না।

প্রায় ১০ হাজার মানুষ ১২ বছর পরিশ্রম করে মন্দিরটি গড়েছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। ছোট ক্লাসের পাটিগণিতের অঙ্কের মতো হিসাবটা শোনালেও মন্দিরটি চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না কাজটা কত কঠিন। বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই কাদার অস্থায়ী দেয়া‌লের ওপর তু‌লে একটার ওপর একটা সা‌জি‌য়ে বানা‌নো হ‌য়ে‌ছে এ ম‌ন্দির। দুই পাথরের মাঝে নেই কোনো সিমেন্ট। কেবল ভেতর দিক দিয়ে লোহার একটা পিন দিয়ে আটকানো। মন্দিরের গায়ে অবশ্য এর তৈরি প্রক্রিয়ার কিছু চিত্র খোদাই করা আছে। হাতি দিয়ে পাথর টানার মতো কিছু চিত্র এখনো দৃশ্যমান।

কথিত আছে, শ্রীকৃষ্ণের ছেলে শম্ভু কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত হওয়ার পরে চন্দ্রভাগা নদীর তীরে এসে সূর্য দেবতার প্রার্থনায় রত হন। ১২ বছর তপস্যা করে তিনি সুস্থ হয়ে ফেরেন। চন্দ্রভাগার লোনাপানি, সূর্য কিরণ আর নিমের বাতাসে তিনি আরোগ্য হয়েছিলেন। তাঁর সম্মানেই এখানে এ সূর্য দেবতার মন্দির নির্মাণ করেন রাজা নরসিংহ দেব।

তৈ‌রির সময় এখা‌নে নাকি রাজামশাই খুব শ‌ক্তিশালী এক চুম্বক লা‌গি‌য়ে‌ছি‌লেন। ওই চুম্বক সাগ‌রে চলাচলকারী জাহাজগু‌লো‌কে বিভ্রান্ত কর‌ত। প‌রে ষোড়শ শত‌কের দি‌কে পর্তু‌গিজরা কাম‌া‌নের গোলা মে‌রে সে চুম্বক ভে‌ঙে দেয়। তা‌তে ম‌ন্দি‌রেরও বেশ কিছু অংশ ভে‌ঙে প‌ড়ে।

কথিত আছে ১৫০৮ সালে যুদ্ধবাজ কালাপাহাড় এই মন্দিরে আক্রমণ করে ক্ষতিসাধন করেন। কালাপাহাড় ছিলেন বাংলার সুলতান সুলেমান খান কাররানির সেনাপতি। এরপর ১৬০৮ সালে মন্দিরের সূর্যদেবের প্রধান মূর্তিটি পুরির জগন্নাথ মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে মন্দিরে পূজা অর্চনা বন্ধ হয়ে যায় এবং কালের গর্ভে হারিয়ে যায় মন্দিরটি। ১৯০৩ সালে ইংরেজ আমলে মন্দিরটি পুনরায় আবিষ্কৃত হয়। তখন ইংরেজরা মন্দিরের কিছু সংস্কারের পরে ভেতরে যাওয়ার পথটি বন্ধ করে দেয়।

কামকলার যে ধরনের চিত্র দেখা যায় কোনার্কে তার প্রকাশ আরও শক্তিশালী ও খোলামেলা। ছবি: গোলাম মর্তুজা

কামকলার যে ধরনের চিত্র দেখা যায় কোনার্কে তার প্রকাশ আরও শক্তিশালী ও খোলামেলা। ছবি: গোলাম মর্তুজা

এই মন্দিরের নাম কোনার্ক হয়েছে কোণ ও অর্কের মিলিত রূপে। কোণ অর্থ কোণা বা অ্যাঙ্গেল। আর অর্ক মানে সূর্য। সূর্যের আলো এই মন্দিরের বিভিন্ন কোণে পড়ে সময়ের নিখুঁত হিসাব দিতে পারে। সাত ঘোড়ায় টানা ২৪ চাকার একটি রথের আদলে গড়া হয় মন্দিরটি। মন্দিরের সাতটি ঘোড়া সাত দিনের প্রতীক। ২৪ চাকার মধ্যে এক পাশের ১২টি ১২ মাসের আর অন্য ১২টি ১২ রাশির প্রতীক। প্রতিটি চাকায় সাতটি নকশা করা দাঁড়ে (স্পোক) আছে সাত দিনের হিসাব। আর আটটি লাঠিতে পাওয়া যায় অষ্ট প্রহরের হিসাব। চাকার মধ্য দাঁড়টির ছায়া কোথায় পড়ছে সে হিসেবে পাওয়া যায় সময়ের নিখুঁত হিসাব। তার আগে বুঝে নিতে হবে উত্তরায়ণ-দক্ষিণায়নের হিসাব। মোটকথা গাণিতিক আর জ্যামিতিক অদ্ভুত সব জটিল আবার সহজ হিসাবে ভরপুর এই মন্দির।

এবার আসা যাক মন্দিরের গায়ে উৎকীর্ণ চিত্রগুলোতে।

মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের নানা চিত্র ফুটে উঠেছে মন্দিরের গায়ে খোদাই করা পাথরে। বিশেষ করে যৌনতার নানা কলা মন্দিরের দেয়ালকে অন্য এক আবেদন দিয়েছে। আমাদের গাইডের মত, ভারতের খাজুরাহো স্থাপত্যে ও মন্দিরগুলোতে কামকলার যে ধরনের চিত্র দেখা যায় কোনার্কে তার প্রকাশ আরও শক্তিশালী ও খোলামেলা।

গাণিতিক আর জ্যামিতিক অদ্ভুত সব জটিল আবার সহজ হিসাবে ভরপুর এই মন্দির। ছবি: গোলাম মর্তুজা 

গাণিতিক আর জ্যামিতিক অদ্ভুত সব জটিল আবার সহজ হিসাবে ভরপুর এই মন্দির। ছবি: গোলাম মর্তুজা 

নৃত্যরত যুগল, চুম্বনের নানা ধরন-ধারণ, পৌরাণিক বিভিন্ন কাহিনি, রাজা-রাজড়াদের কাজকর্ম, শিকার ইত্যাদি নানা দৃশ্য মন্দিরের গায়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সুলক্ষণা, কুলক্ষণা নারীর লক্ষণ বিচার, রোগগ্রস্ত, সন্তানবতী নারীদের আরোগ্য লাভের নানা নিদানও মন্দিরের গায়েই ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। কালের আবর্তে পাথরের খোদাইও মিশে গেছে। তবে এখনো যা আছে তাতেই চোখ কপালে উঠতে যথেষ্ট।

মন্দিরের সামনে রয়েছে নাটমণ্ডপ। এখানে দেবতাদের উদ্দেশে নৃত্যপূজা নিবেদন করা হতো।

এই মন্দিরের ওপরে রয়েছে সূর্য দেবতার মূ‌র্তি। বহুবার হামলার শিকার হয়েও সূর্য দেবতা আর মন্দির এখনো স্বমহিমায় ভাস্বর।

সোর্স – প্রথম আলো।
গোলাম মর্তুজা, ওডিশা (ভারত) থেকে
১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭