টয় ট্রেনে সিমলার পথে। গাড়ির লাইনটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। অনেক দূর থেকে ভেসে আসা বুলডোজারের একটানা গোঁ গোঁ শব্দটা কান সওয়া হয়ে গেছে। রাস্তার পাশে প্রায় শূন্যে ভেসে থাকা ছোট চায়ের দোকানটায় অনেকক্ষণের অপেক্ষা। চায়ের কাপে যেই মাত্র চুমুক দিতে যাব তখনই শ খানেক গাড়ির সম্মিলিত হর্ন কর্ণকুহরে তালা লাগিয়ে দিল। অর্থাৎ রাস্তা পরিষ্কার করা হয়েছে, ‘ভাই, এবার আগে বাড়।’ দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম। পিঁপড়ের মতো সারি বেঁধে গাড়ি চলতে শুরু করল। শুরু হলো আমাদের কিন্নর অভিযান।

ভোরে সিমলা থেকে বেড়িয়েছি সাংলার উদ্দেশে। সারা রাত বৃষ্টির ফলাফল রাস্তা বন্ধ। সাংলা যেতে পাড়ি দিতে হবে ২৩০ কিলোমিটার। কুফরি, ফাগু, নারকোন্ডা পার হয়ে খরস্রোতা শতদ্রু নদীর পাড় ধরে চলেছে আমাদের গাড়ি। নিচে শতদ্রুর বাঁধ না-মানা ঘোলা জলের গর্জন। কেমন গা শিরশিরে অনুভূতি নিয়ে হাজির হলাম কিন্নর ঢোকার আগের বড় শহর রামপুর।

রামপুর অতীতের রাজপুত রাজ্য বুশাহারের রাজধানী। শহরে ঢোকার মুখেই বিশাল হনুমান মন্দির। বাসস্ট্যান্ডের উল্টো দিকেই বুশাহার রাজাদের বাসস্থান পদম প্যালেস। অসাধারণ লাগল বাসস্ট্যান্ডের ধারের ভেজ হোটেলের টক চাটনি দিয়ে আলু-পরোটা, সেই সঙ্গে দিনের প্রথম চা। গাড়ি আবার যাত্রা করল সাংলার পথে। ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে রাস্তা। রুক্ষ হচ্ছে প্রকৃতি। ভাবানগর, ওয়াংটু পেরিয়ে টাপরি। তারপর কারছাম। এখানেই শতদ্রুর সঙ্গে এসে মিশেছে বাসপা নদী। কারছাম এসে জাতীয় সড়ক ছেড়ে আমরা ডান দিকের রাস্তা ধরলাম। বেশ খাড়া আর সরু রাস্তা। ওদিকে সন্ধ্যা নেমে আসছে দ্রুত। রাস্তার বাঁ-পাশের পাহাড় হাতড়ে হাতড়ে রাত আটটার দিকে এসে পৌঁছালাম সাংলায়। হোটেল প্রকাশে।

পরের দিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙল পাখির কিচিরমিচির শব্দে। পর্দা সরিয়ে জানালা খুলে বাইরে তাকাতেই দেখি, চারপাশে সবুজ আর সবুজ। কিন্নরের অনন্যসুন্দর উপত্যকা সাংলা। আপেলবাগানে ঘেরা এই উপত্যকার বুক চিরে বয়ে চলেছে সরু ফিতার মতো বসপা নদী।

রওনা দিলাম ছিটকুলের দিকে। তিব্বত সীমান্তে ভারতের সর্বশেষ গ্রাম এই ছিটকুল। পাইন, দেবদারুর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলেছে আমাদের গাড়ি। একটু পরই বিপত্তি। রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে পাথর আর পানিতে। বাঁ-দিকে উঁচু পাহাড় থেকে বরফগলা পানি পাথর নিয়ে রাস্তার ওপর দিয়ে নেমে যাচ্ছে ডানপাশের বসপা নদীর দিকে। বহু কসরতের পর পার হলাম সেই ছোটখাটো নদী। তারপর ছিটকুলে। এখান থেকে তিব্বত সীমান্ত মাত্র ৩০ কিলোমিটার। সাংলা বেড়ানো শেষ করে পা বাড়ালাম কিন্নরের আরেক অনন্যসুন্দর স্থান কল্পার দিকে। দূরত্ব ৫১ কিলোমিটার। চললাম কিন্নরের জেলা সদর রেকংপিও হয়ে কেলংয়ের দিকে। একসময় কেলং ছিল কিন্নরের জেলা সদর। কিন্তু নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কেলংয়ে অত্যধিক তুষারপাত হয়। তাই কেলং থেকে ১৬ কিলোমিটার নিচে রেকংপিওতে নামিয়ে আনা হয় জেলা সদরকে। এখান থেকেই দিব্যি দেখা যায় কিন্নর-কৈলাস পর্বতের বরফমোড়া শিখর।

রেকংপিও থেকে কল্পার পথটি অসাধারণ সুন্দর। রাস্তার পাশেই আপেলবাগান, আঙুর আর নাশপাতি গাছের সারি। দূর থেকেই চোখে পড়ল চিনিগ্রামের বৌদ্ধ গুম্ফাটি। কিন্নর-কৈলাসের বরফছোঁয়া হিমশীতল হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে গুম্ফার প্রেয়ার ফ্লাগগুলো।

পাইন, ফার আর দেবদারুতে ছাওয়া কল্পার সৌন্দর্য অতুলনীয়। রেকংপিও থেকে কল্পা আসার পথে গাছপালা আর বাড়িঘরের ফাঁকফোকর দিয়ে দেখা কিন্নর-কৈলাস কল্পায় এসে ধরা দেয় একদম হাতের মুঠোয়। বরফে মোড়া পাহাড়ের সারি অন্যদিকে চোখ সরাতে দেয় না, চারপাশের তুষারে মোড়া পর্বতশৃঙ্গের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছয় হাজার ৫০ মিটারের কিন্নর-কৈলাস শৃঙ্গ। কৈলাস শৃঙ্গ থেকে ডানদিকে খানিকটা নিচেই বিখ্যাত শিবলিঙ্গটির অবস্থান। ৭৯ ফুট উঁচু গ্রানাইটের শিবলিঙ্গটি দিনের বিভিন্ন সময় রং বদলায়। পরের দিন সকালেই হোটেল বদল করতে হলো। বড়সড় একটা গ্রুপের বুকিং আছে এখানে। কী আর করা, পাশের হোটেলে উঠলাম ব্যাগপত্তর নিয়ে। এখানেই দেখা পেলাম হোটেল ভবনটির মালিকের। জানালেন ১৯৭১ সালে মিত্রবাহিনীর হয়ে বাংলাদেশে যুদ্ধ করার কথা। কল্পায় অসাধারণ দুটি দিন কাটিয়ে এবারে গন্তব্য সারাহান। সিমলার দিকে ফিরতি পথ ধরে চলল গাড়ি। বাঁশপুরের খানিক আগে জিওরি। এখান থেকে পথ উঠে গেছে সারাহানের দিকে। এই ১৭ কিলোমিটার পথের পুরোটাই আপেলবাগানে ঘেরা। বিকেল নাগাদ হোটেলে মালপত্তর রেখে বেরিয়ে পড়লাম সারাহানের মূল দ্রষ্টব্য ভীমকালী মন্দির দেখতে। এর খ্যাতি ভারতজুড়ে। তিনতলা মন্দিরটির দেয়ালজুড়ে কাঠের কাজের নকশা। মন্দির কমপ্লেক্সের ভেতরে আছে অতিথিশালা। বেশ সস্তায় থাকা যায় এখানে। সন্ধ্যা নেমে আসছে সারাহানে। বিকেলের এক পশলা বৃষ্টিতে পুরো চরাচর ভেজা। ডিম ভাজার গন্ধ, ডালে বাগাড় দেওয়ার চ্যাঁ চ্যাঁ শব্দ কানে মধু ঢেলে দিল। অনেক হয়েছে প্রকৃতিপূজা। এবার শুরু হোক পেটপূজা। ভোরে দুর্গম জালোরির পাশ দিয়ে মানালি যেতে হবে। জানালা বন্ধ করে পা বাড়ালাম খাবার টেবিলের দিকে।

কীভাবে যাবেন?
কলকাতার হাওড়া থেকে কালকা মেলে ৩৪-৩৫ ঘণ্টার জার্নি করে কালকা স্টেশনে নেমে সেখান থেকে টয় ট্রেনে বা গাড়িতে পৌঁছানো যায় সিমলা। অন্য কোনো ট্রেনে কলকাতা থেকে দিল্লি বা চণ্ডীগড় পৌঁছে—সেখান থেকে বাস বা গাড়িতে করে পৌঁছানো যায় সিমলা। সিমলা থেকে গাড়ি ভাড়া করে কিন্নর ঘুরে বেড়ানো সুবিধাজনক। সিমলার ম্যাল থেকে গাড়ি ভাড়া করে নেওয়া যায়। ছোট গাড়ির ভাড়া দিনপ্রতি এক হাজার ৬০০ রুপির মতো, আর জিপ ভাড়া নেবে দুই থেকে দুই হাজার ২০০ রুপি। সিমলা থেকে কিন্নর ঘুরে যদি মানালি যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তবে সাংলা, কল্পা, সারাহান হয়ে জালোরির পাশ দিয়ে মানালি চলে যেতে পারেন। নয় তো সারাহান থেকে সাংলা হয়ে কল্পা ঘুরে সিমলা ফিরে আসুন।

কখন যাবেন?
কিন্নর বেড়ানো যায় এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। তবে এপ্রিল-মে মাস কিন্নর ঘোরার জন্য আদর্শ। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাস সারা কিন্নর আপেলে ভরা থাকে।

ফখরুল আবেদীন
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১২