কানহার অ্যানিকাটে হাতিরা

মুলোর মতো দাত, কুলোর মতো কান। ইয়া মোটা মোটা পা ফেলে ওরা যখন এগিয়ে আসে তখন মানুষ তো কোন ছাড় সাক্ষাৎ রয়েল বেঙ্গাল টাইগারও থমকে যায়। এই যে কানহা বান্ধবগড়ে দিনের পর দিন হাজার হাজার মানুষ বাঘ দেখে খুশি হয়ে বাড়ি ফিরে যায় তার পেছনে রয়েছে ওদের উদয়াস্ত পরিশ্রম। ওদের নাম শিবাজি তারা বনদেবী চঞ্চলকুমারী নির্মিলা রানা প্রতাপ… ওদের কেউ কানহা কেউ কিসলি কেউ মুক্কি রেঞ্জে থাকে।

কানহার অ্যানিকাটে হাতিরা

ওরা হাতি। সারা বছর ভোর চারটের সময় উঠে ওরা রওনা হয়ে পড়ে বাঘের খোজে। গভীর জঙ্গলে এ দিক ও দিক ঘুরতে থাকে যতক্ষণ না বাঘের দেখা পাওয়া যায়। একবার পেয়ে গেলে তখন ওদের এক দল বাঘকে ঘিরে রাখে অন্যরা চলে যায় পর্যটকেদের আনতে, পিঠে করে বাঘ দেখাতে। টাইগার শোয়ে বাঘ দেখে শহরের বাবুরা খুশি হয়ে শহরে ফিরে যান। জঙ্গলের জন্তুরা জঙ্গলে থেকে যায়। থাকে হাতিরাও। তবে কানহার জঙ্গলে হাতি নেই। ওদের বাইরের জঙ্গল থেকে আনা হয়, পোষ মানানো হয়। জঙ্গলের নানান রকমের কাজ করে সারা দিন ধরে। প্রত্যেকের জন্যে একজন করে চারাকাটার যারা ওদের দেখাশোনা আর যেত্নর দায়িেত্ব থাকেন। একজন করে মাহাওয়াত যারা হাতিদের দিয়ে কাজ করান। করান বটে কিন্তু হাতি আর মাহাওয়াতের মধ্যে সম্পক মোটেই মালিক আর কর্মীর মতো নয়। হাতি অত্যন্ত বুিদ্ধমান আর সেনসিটিভ প্রাণী। ওদের দিয়ে কাজ করান যারা তাদেরও বোধবুিদ্ধ যথেষ্ট থাকা চাই নয়ত ঠিকমতো ম্যানেজ করেতে পারবেন না। হাতিদের প্রতি মাহাওয়াতেদের এক আশ্চর্য রকম মমতা আর দরদ থাকে যা অনেকসময় মানুষের প্রতি মানুষেরও থাকে না। হাতিরা তা বোঝে সুতরাং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে কাজ কর্ম চলতে থাকে।

হাতিরা স্নান করছে।

তবে শুধু কাজ নয়। বিশ্রামও পায় কানহার হাতিরা। কানহার জঙ্গলের ভেতরে উতরাই চড়াই রাস্তা জঙ্গল ময়দান নালা পাহাড় তো আছেই আর আছে বড় বড় জলাশয় যা অ্যানিকট বলে পরিচিত। জঙ্গলে বাঘ দেখতে ব্যস্ত অতিথিদের চোখে অনেক সময় অ্যানিকট দেখাই দেয় না। তারা খেয়ালও করেন না বিকেল সাড়ে তিনটে চারটে বাজতে না বাজতেই চারাকাটারেরা হাতিদের নিয়ে জঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায় অ্যানিকটে পৌছে যান। তারপর শুরু হয় স্নান পর্ব। অগভীর জলের মধ্যে মনের সুখে হাতিরা শুয়ে থাকে আর চারাকাটারেরা তাদের গা খুব করে মাজতে থাকে।

জঙ্গলের মধ্যে চিতাবাঘ আর বাঘের খোজ করতে করতে চোখ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন কিন্তু অ্যানিকাটের মধ্যে হাতির এই জলকেলি দেখতে বেশ লাগে। সেবার যেমন হল। জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে বিকেল পড়ে আসছে। কিছুক্ষণ আগে কানহা ময়দানের সোনালি ঘাসের মধ্যে দিয়ে এক বিশাল বাঘকে রাজকীয় ভঙ্গিতে চলে যেতে দেখেছি। তার গায়ে শীতের সোনালি রোদ চমকাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল বাঘের গা সোনার জল দিয়ে ধুয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই দেখে যা আনন্দ তা আর বলার নয়। বিকেলের পার্ক রাউণ্ডের সময় ফুরিয়ে আসছে। এখন একটু পরিশ্রান্তও লাগছে। এমন সময় জলের ধারে গাড়ি থামল। সেখানে তখন হাতিরা স্নান করছে।

জলের মধ্যে মনের সুখে হাতিরা শুয়ে থাকে

বনদেবী চঞ্চলকুমারী জলের মধ্যে পাশ ফিরে শুয়ে আছে, রানা প্রতাপ জল থেকে উঠে আসছে। এত দিনে ওর আসল গায়ের রঙ যে কী তা জানা গেল। পাশে আর একজন দাড়িয়ে থাকতে থাকতে গরম বোধ করছে বলে শুড় দিয়ে নিজের গায়ে জল দিচ্ছে। সদ্য স্নাত হাতি দেখার মধ্যে থেরাপিউটিক কোনও প্রভাব আছে কি না জানি না। আমার কিন্তু দারুণ আরাম লাগছিল। মনে হল, ওদের স্নান করা দেখতে দেখতে সারা দিন জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর ক্লান্তি কত সহজে মিলিয়ে গেল।

শুড় দিয়ে নিজের গায়ে জল দিচ্ছে

স্নানের পর খাওয়ার পালা। কিসলি গেটের বাইরে বড় আমগাছের পেছন দিকে মধ্যপ্রদেশ পর্যটনের গোল ছাদওয়ালা ক্যানটিন। তার পেছনে স্টাফ কোয়াটার্স। মাঝামাঝি জায়গায় একটা বাড়িমতো আছে। প্রথম ধাক্কাতে পোড়ো বাড়ি বলে মনে হয়। জানলা নেই দরজা নেই ছাদটা কোনও রকমে টিকে আছে। আসলে ওটা হাতিদের ডাইনিং হল। সূর্য যখন ডোবার আয়োজন করার কথা ভাবে ঠিক সেই সময় একে একে হাতিরা খাবার ঘরের চারদিকে হাজির হয়। এ সব দেখার জন্যে মাঠ পেরিয়ে ওদের ঘরে যাওয়ার দরকার হয় না। পিচের রাস্তার ওপর কালভার্ট বা পুলিয়া থেকেই এত্তো সব দেখা যায়। দেখা যায় ছেঁড়া শুড় রানা প্রতাপকে, তারা ওর সঙ্গে মারামারি করে শুড় ঁছিড়ে দিয়েছিল অনেক কাল আগে। দেখা যায় তারাকেও, ছেলেমেয়ে কৃষ্ণা আর ভরতকে নিয়ে আসতে। জন্মাষ্টমীর দিন জেন্মছিল বলে হাতির নাম কৃষ্ণা রাখা হয়। তারা আর আজকাল খুব বেশি মারামারি করে মনে হয় না। ধপধপে সাদা এক জোড়া প্রকাণ্ড দাত নিয়ে আসে শিবাজি। ওর মাহাওয়াত শিব্বর ভাল ফটোগ্রাফার বলে নাম করেছেন। বরাতু নিয়ে আসে বনদেবীকে।

স্নানের পর খাওয়ার পালা।

আজকের মেনু ভাত। মাঝারি তরমুজের মতো ভাতের গোলা, প্রত্যেকে তিন থেকে চারটে করে পাবে। সব শেষে মিিষ্টমুখ হিসেবে একটু গুড়। ঘরের চারপাশে দাড়িয়ে শুড় নাড়তে থাকে হাতিরা। এক একটা করে গোলা ওদের মুখে তুলে দেয় বনকর্মীরা। ছোট্ট ভরতের আর তর সয় না। সে শুড় বাড়ায় ভাতের হাড়ির দিকে, সুতরাং ভাতের সঙ্গে তাকে কিছু বকুনিও খেতে হয়। যে দিন ভাত হয় না সে দিন রুটি খায় হাতিরা। হাতির সাইজের সঙ্গে মানানসই রুটি। এক কিলো আটার তৈরি এক একটা রুটি, এমন দশটা করে রুটি দেওয়া হয় প্রত্যেকজনকে। খাওয়া শেষ করা ওরা ধীর পায়ে ফিরে যায় নিজেদের এলাকায়। রাতে ওদের ছাড়াই রাখা হয়। সারা রাত চড়ে বেড়ায় আবার সকালে কাজ।

টাটরি গ্রামে বছরে একবার মেলা হয়, স্থানীয় নাম মড়ই

হাতির খাওয়া দেখতে দেখতে অন্য কথাটা ভুলেই গিয়েছিলাম। সূর্য যে ডুবতে চলল। আজ না মেলায় যাওয়ার কথা! ছুটলাম ঘরে। ওরা সবাই তৈরি ছিল। ছুটল জিপসি টাটরির দিকে। কামতা পঞ্চায়েতের মধ্যে টাটরি গ্রাম। বছরে একবার করে এখানে যে মেলা হয় তার স্থানীয় নাম মড়ই। যে কোনও হাট বা সাপ্তাহিক বাজারের চেয়ে এ অনেক বড় মেলা। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসে কেনাকাটা করতে কিংবা নিছক দেখতে। চাষ করা জমি, ইতস্তত গাছ আর মাঝেমাঝে রুক্ষ জমি পেরিয়ে আমাদের গাড়ি চলেছে। সাবধানে। আজ রাস্তায় অন্যান্য দিনের চেয়ে অনেক বেশি ভিড়। মেয়েরা রঙিন রঙিন সিনথেটিক শাড়ি পরে মাঠ পেরিয়ে চলেছে মড়ইয়ে। চলেছি আমরাও।

আহিরদের লাল নীল পোশাকে কড়ি দিয়ে নকশা করা জামাকাপড়

পৌছলাম যখন মেলা তখন লোকের ভিড়ে জমজমাট। সারি দিয়ে দোকানপাট খুলে বসেছে ব্যাপারিরা। প্লািস্টকের খেলনা থেকে শুরু করে রান্নাঘরের সামগ্রী, মশলা, বেল্ট এমনকি তরিতরকারি পর্যন্ত। মড়ইয়ে সবই পাওয়া যায়। মাঠের মাঝখানে টেবিল পেতে বসে আছে মেহেন্দিওয়ালা। কাঠে খোদাই করা নকশা, রঙে চুবিয়ে হাতে ছাপ দিলেই ইন্সটান্ট কফির মতো ইন্সটান্ট মেহেন্দি, রঙ দিন দেড়েক মতো থাকে।

মড়ইয়ে সবই পাওয়া যায়

এ সব তো আছেই, তবে মড়ইয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল নাচ। যে কেউ এই নাচে যোগ দিতে পারলেও আসল নাচের ভার আহিরদের ওপরে। এরা আদিবাসী। বছরের অন্য সময় অন্য কাজ করলেও এই সময় ওঁরা ঠিক এসে পড়েন টাটরির মড়ইয়ে নাচতে। লাল নীল পোশাকে কড়ি দিয়ে নকশা করা জামাকাপড়, হাতে সাজানো লাঠি। সূর্য যখন অেস্ত ঢুলে পড়ে ঠিক তখন হঠাৎ চারদিক ঝমঝমিয়ে ওঠে, আহিররা নাচ শুরু করে। ওদের ঘিরে ভিড় করে থাকে কাছে দূরের গ্রামের মানুষ। সকলের মুখে হাসি, চোখে আনন্দ।

হপানের বাহার মেলায়।

মণ্ডলা জেলার রুক্ষ পাথুরে মাটিতে মানুষের জীবন মোটেই সহজ নয়। এই অঞ্চল আদিবাসী প্রধান। আদিবাসীদের জীবন আরওই কঠিন। তবু এখানে আনেন্দর কমতি নেই। উন্নত শহুরে মানুষের তুচ্ছ তাচ্ছিল্যে ওরা আজ একেবারে কোণঠাসা। শহুরে ভাষায় ওরা হল পিছিয়ে থাকা। অনেক অভাব। তবু প্রাণের উষ্ণতার অভাব দেখা যায় না। আত্মসম্মানবোধ ওদের ত্যাগ করেনি। প্রকৃতির অনেক গোপন খবর ওরা রাখে। হারিয়ে যেতে বসা অনেক জ্ঞান ওদের হাতের মুঠোয়। সেই বিদ্যার স্বীকৃতি যতক্ষণ না বিদেশি মানুষ দিচ্ছে ততদিন আমাদের দেশের মানুষের কাছে তার কোনও মূল্য নেই। স্বাধীনতার ৫৭ বছর হতে চলল আমরা এখনও বিদেশিদের হাত ধরা, অথচ পিছিয়ে পড়া এইসব মানুষ মনে প্রাণে স্বাধীন। ওদের মনের আনন্দ আমাদের মতন অর্বাচীনদের পক্ষে কেড়ে সম্ভব নয়। অনুসরণ করাও সম্ভব নয় কেন না, অনেক উন্নত বোধ আর জ্ঞান ওদের আছে। আমাদের নেই। তাই ওদের হাসি স্বতঃস্ফূর্ত। মড়ইয়ে তরকারি কাটছিল মেয়েটি। স্বচ্ছ দৃষ্টি তীক্ষ্ণ নাক গোল মুখ মাজা রঙ। আমি তাকিয়ে হেসেছিলাম। জবাবে হাসল ও। ঝকঝকে হাসি। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। হাতে ক্যামেরা তবু ছবি তোলার চেষ্টাও করিনি। ছবি নেই কিন্তু হাসিটা মনে রয়ে গিয়েছে। ওই হাসির তুলনা হয় না। যথারীতি এ বারেও আমি খালি হাতে ফিরিনি। মধ্যপ্রদেশ আমাকে, শুধুই আমাকে বাড়তি কিছু উপহার দিয়ে দিল।

সকলের মুখে হাসি, চোখে আনন্দ

সুভদ্রা ঊর্মিলা মজুমদার
সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৭ এপ্রিল ২০০৫

Sending
User Review
0 (0 votes)

Add Comment