ঐতিহ্যের দিনাজপুরে

উত্তরবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন জনপদ দিনাজপুর। এ জেলার উত্তরে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়, দক্ষিণে গাইবান্ধা ও জয়পুরহাট, পূর্বে নিলফামারী ও রংপুর জেলা এবং পশ্চিমে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। ইতিহাস থেকে জানা যায় দিনাজপুর রাজ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জনৈক দিনাজ অথবা দিনারাজ এর নামানুসারে এ জনপদের নামকরণ করা হয়। নানান প্রাচীন নিদর্শনসহ এ জেলার বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ভ্রমণ উপযোগী অনেক জায়গা।

দিনাজপুর রাজবাড়ি

দিনাজপুর শহরের উত্তর-পূর্ব পাশে অবস্থিত ধ্বংসপ্রায় এ রাজবাড়িটি। প্রবেশপথের শুরুতেই ডানদিকে চোখে পড়বে ছোট্ট একটি প্রাচীন কৃষ্ণ মন্দির। আর বাঁঁ দিকে রয়েছে প্রাচীন রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ এবং একটু ভেতরের দিকে একটি রয়েছে আরেকটি মন্দির। প্রায় সতের একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত এ রাজবাড়িতে এক সময় জমিদারবড়ির প্রধান তিনটি মূল অংশ আয়না মহল, রানী মহল ও ঠাকুরবাড়ি মহল ছাড়াও বেশ কয়েকটি মন্দির, অতিথিশালা, চিকিতসালয়, রাজ কর্মচারীদের আবাসস্থল, দীঘি ইত্যাদি ছিল। আর এগুলোর বেশিরভাগই নির্মাণ করেছিলেন মহানাজা প্রাণনাথ ও তার পোষ্যপুত্র রামনাথ অস্টাদশ শতাব্দির কোন এক সময়। এসবকিছুই এখন পড়ে আছে শুধু ধ্বংসস্তুপ হয়ে। দিনাজপুর শহর থেকে এখানে রিকশায় আসতে সময় লাগে আধা ঘন্টার মতো।

চেহেলগাজী মাজার ও মসজিদ

দিনাজপুর শহর থেকে সাত কিলোমিটার উত্তরে দিনাজপুর-রংপুর সড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত এ অঞ্চলের এক সময়ের সাধু পুরুষ চেহেলগাজীর মাজার ও মসজিদ । দিনাজপুর জাদুঘরে সংরক্ষিত এ মসজিদের একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহ এর রাজত্বকালে তার উজির ইকরাব খানের নির্দেশে দিনাজপুর পরগনার শাসনকর্তা উলুঘ নুসরত খান এ মসজিদটি ৮৬৫ হিজরি তথা ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মাণ করেন। চার পাশের দেয়াল ছাড়া বর্তমানে মসজিদটির সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে।

আর মসজিদের আরেকটি শিলালিপি থেকে জানা যায় ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দে চেহেলগাজী মসজিদ নির্মাণের সময় মাজারটি সংস্কার করা হয়। জনশ্রুতি আছে ৪০জন গাজীকে (ধর্মযোদ্ধা) এখানে একত্রে সমাহিত করা হয়েছিল। এ জন্য এ স্থানের নাম চেহেল (চল্লিশ) গাজী। দিনাজপুর শহর থেকে বাসে কিংবা রিকশায় আসতে পারেন এখানে।

কান্তজিউ মন্দির

দিনাজপুর শহর থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে কাহারোল থানার কান্তনগর গ্রামে অবস্থিত কান্তজিউ মন্দির। অনেকের মতে কান্তনগরে স্থাপিত বলে-এর নাম কান্তজিউ মন্দির। জনশ্রুতি আছে, শ্রী-কৃষ্ণের বিগ্রহ অধিষ্ঠানের জন্য এ মন্দির নির্মিত হয়েছিল। দিনাজপুরের তৎকালীন জমিদার প্রাণনাথ রায় ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে পোড়ামাটির অলঙ্করণ সমৃদ্ধ এ মন্দিরটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন। তবে তার জীবদ্দশায় এ মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ করে যেতে পারেন নি। পরে ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে তারই পালক পুত্র রাম নাথ রায় মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ করেন। এর পরে তিনি এ মন্দিরটি শ্রী কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন।

স্থাপত্যিক রীতি, গঠন বিন্যাস, শিল্পচাতুর্য মন্দিরটির সামগ্রিক দৃশ্যকে এতই মাধুর্যমণ্ডিত করে তুলেছে যে এর চেয়ে সুন্দর, নয়নাভিরাম মন্দির বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই। শৈল্পিক বিশ্লেষণে প্রায় ৩ ফুট উঁচু এবং ৬০ ফুট বাহু বিশিষ্ট প্রচ্চর নির্মিত বর্গাকৃতি সমান্তরাল জায়গার উপর এই মন্দির দণ্ডায়মান। সৌধ পরিকল্পনায় মন্দিরটি তিন ধাপে নির্মিত। সামগ্রিক দৃষ্টিতে মন্দিরটি দেখতে সুবৃহৎ রথের মতো। তিনতলা বিশিষ্ট এবং বর্গাকারে নির্মিত মন্দিরের প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ্য ৫২ ফুট এবং উচ্চতা ৭০ ফুট। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে কিছু অংশ ভেঙে যাওয়ায় উপরের গম্বুজ ঘরের আকৃতি ধারণ করেছে। ভূমিকম্পে ভেঙে যাওয়ার আগে গম্বুজের উপরে ৯টি সুদৃশ্য চুড়া ছিল। বারান্দার সামনে রয়েছে ইটের তৈরি দুটি করে চ্চম্ভ। এই চ্চম্ভের সাহায্যে দেয়ালের সঙ্গে প্রত্যেক পাশে সংযুক্ত রয়েছে তিনটি করে খোলা দরজা। দ্বিতীয় তলার দক্ষিণ পাশের দরজা দু’টি বেশি লক্ষ্য করা যায়। এই দরজার পরে, ভেতরে মূল কামরা, সেখানে আছে মোট ১৮টি কক্ষ। বড় কামরাগুলোর চারিদিকে আছে ছোট কামরা। মন্দিরের বেদির নিচে এবং দেয়ালের গায়ে পোড়ামাটি খচিত প্রায় লক্ষাধিক ছবি রয়েছে। পৌরণিক চিত্র সংবলিত টেরাকোটা ছাড়াও মন্দিরের দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মূর্তির টেরাকোটাও রয়েছে। এসব টেরাকোটার মধ্যে নারী-পুরুষ, দেবতা ও কিন্নর, গায়ক ও বাদক, যোদ্ধা ও শিকারী, গৃহিনী, নৌকার মাঝি, নৃত্যরতা রমণী, পালকি বাহক, গাছ-পালা, ফল ও ফুল, লতা-পাতা ইত্যাদির ছবি মূর্তমান। কান্তজিউ মন্দিরের পাশেই রয়েছে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত এক চূড়া বিশিষ্ট একটি মন্দির এটিও নির্মাণ করেন মহারাজা প্রাণনাথ। রাজা প্রাননাথ এই মন্দির নির্মাণ করে এখানে কৃষ্ণের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এই মূর্তি তিনি এনেছিলেন বৃন্দাবন থেকে। এ মন্দিরটি ছিল ১৬ পার্শ্ব সংবলিত সৌধ এবং ৪০ ফুট উচ্চতায়। কান্তজিউ মন্দিরের ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতি বছর রাস পূর্ণিমায় এখানে বসে পক্ষকালব্যাপী মেলা।

দিনাজপুর কেন্দ্রীয় বাস স্টেশন থেকে পীরগঞ্জের বাসে কান্তনগর নামতে হবে। ভাড়া জনপ্রতি ২০-২৫ টাকা। সেখানে নেমে ঢেপা নদী পার হয়ে একটু সামনেই মন্দিরটি। শীতের সময় নদী পায়ে হেঁটে পার হতে পারলেও এই বর্ষায় কিন্তু নৌকায় পার হতে হবে।

নয়াবাদ মসজিদ

কান্তজিউ মন্দির থেকে মাইলখানেক দূরে রয়েছে ঐতিহাসিক নয়াবাদ মসজিদ। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটিও কান্তজি’র সমসাময়িক মসজিদ। এ মসজিদটিতে তিনটি প্রবেশপথ এবং একটি মিহরাব রয়েছে। মসজিদের বাইরে চারপাশ সামান্য উঁচু দেয়ালে ঘেরা এবং দেয়ালের ভেতরের খোলা জায়গা পাকা করা, কান্তজিউ থেকে নয়াবাদ মসজিদ যেতে পারেন রিকশা কিংবা ভ্যানে চড়ে।

রামসাগর

দিনাজপুর শহর থেকে আট কিলোমিটার দক্ষিণে আউলিয়াপুর ইউনিয়নে অবস্থিত রামসাগর দীঘি। প্রজাদের সেচ সুবিধা ও জলকস্ট দূরীকরণের লক্ষ্যে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীর মাধ্যমে রাজা রামনাথ এ দীঘি খনন করেন। চারপাশের চত্ত্বরসহ এ দীঘির মোট আয়তন প্রায় ৪৩৭৪৯২ বর্গমিটার। মূল দীঘি অর্থাত জলভাগের দৈর্ঘ্য ১০৩১ মিটার আর প্রস্থ ৩৬৪ মিটার। দীঘির চারপাশে মনোরম বাগান বেস্টিত। শহর থেকে বিকশায় যেতে সময় লাগে প্রায় এক ঘন্টা।

স্বপ্নপুরী

দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ৫২ কিলোমিটার দূরে নবাবগঞ্জ উপজেলার আফতাবগঞ্জে অবস্থিত বেসরকারী পর্যটন কেন্দ্র স্বপ্নপুরী। প্রায় ১৫০ একর জমির উপরে এখানে নির্মাণ করা হয়েছে চিড়িয়াখানা, বাগান, লেক, রেস্ট হাউস, বনভোজন কেন্দ্র ইত্যাদি। দিনাজপুর শহর থেকে বাসযোগে সহজেই আসতে পারেন স্বপ্নপুরী।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে দিনাজপুরের দূরত্ব সড়কপথে ৪১৪ কিলোমিটার এবং রেলপথে ৪৮৩ কিলোমিটার। এছাড়া খুলনা ও রাজশাহী থেকে সড়কপথ ও রেলপথে দিনাজপুর আসা যায়। ঢাকা থেকে দিনাজপুরগামী বাস ছাড়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। ভাড়া ৩০০-৩৫০ টাকা। এ পথে ভাল বাস সার্ভিস হলো- হানিফ এন্টারপ্রাইজ- ৮০১৩৭১৪, ৮০১৫৩৬৮, এস আর ট্রাভেলস-৮০১৩৭৯৩, ৮০১৯৩১২, কেয়া পরিবহন-৯০০০৮১২, এসএ পরিবহন-৯৩৩২০৫২, শ্যামলী পরিবহন-৯০০৩৩১। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন আন্ত:নগর দ্রুতযান ছাড়ে সন্ধ্যা ৭টা ৫গ মিনিটে। আর আন্ত:নগর একতা এক্সপ্রেস ছাড়ে সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে। ভাড়া শোভন সিট ১৮৫ টাকা, শোভন চেয়ার ২৫০, প্রথম শ্রেণী চয়ার ৩৫০, প্রথম শ্রেণী বার্থ ৫৩৫, এসি চেয়ার ৬১৮, এসি বার্থ ৮৯৭ টাকা। দিনাজপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে দ্রুতযান এক্সপ্রেস ছাড়ে সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে আর একতা বক্সেপ্রেস ছাড়ে সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে।

কোথায় থাকবেন

দিনাজপুর শহরে থাকার জন্য ভালো মানের হোটেল হচ্ছে পর্যটন, মোটেল। ফোন- ০৫৩১-৬৪৭১৮। এছাড়া ঢাকায় পর্যটনের প্রধান কার্যালয় থেকেও এ মোটেলের বুকিং দিতে পারেন। ফোন- ৯৮৯৯২৮৮-৯১ । দিনাজপুরের পর্যটন মোটেলে এসি টুইনবেড ১৫০০ টাকা এবং এসি টুইনবেড ডিলাক্স কক্ষ ১৮০০ টাকা। এছাড়া দিনাজপুরের অন্যান্য সাধারণ মানের হোটেলে ১০০-৮০০ টাকায় রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা আছে। কয়েকটি সাধারণ মানের হোটেল হলো- মালদহ পট্টিতে হোটেল ডায়মন্ড, ফোন- ০৫৩১-৬৪৬২৯। নিমতলায় হোটেল আল রশিদ-০৫৩১-৬৪২৫১। হোটেল নবীন- ০৫৩১-৬৪১৭৮, হোটেল রেহানা- ০৫৩১-৬৪৪১৪, নিউ হোটেল- ০৫৩১-৬৮১২২।

আলোকচিত্র ও লেখা মুস্তাফিজ মামুন
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ফেব্রুয়ারী ২৩, ২০১০

Sending
User Review
0 (0 votes)

Add Comment