একদিনের অবকাশে…

বিসৃ্তত সবুজ মাঠ। বিলের পানিতে দুলছে শাপলা। দূরে ঘন সবুজ গাছের সারি। তাজা বাতাসে সতেজ হয়ে ওঠে মন। শিকারের নেশায় সাদা বকগুলো উড়ে গিয়ে বসে এক বিল থেকে আরেক বিলে।
ঢাকার মতো ইট-পাথরের শহরে বসবাস করেন এমন মানুষের মন নিশ্চয়ই অস্থির হয়ে উঠেছে! ভাবছেন কোথায় এমন জায়গা!
মনে হবে এটি বোধহয় অনেক অনেক দূরে। মোটেও দূরে নয়। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র এক-দেড় ঘণ্টার পথ। গাজীপুর জেলার পূবাইল অঞ্চলের বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে।
যারা শুক্র বা শনিবারের মতো ছুটির দিনে একটু বেড়িয়ে আসতে চান তাঁরা খুব সহজেই বেছে নিতে পারেন পুবাইলের এই সুন্দর সবুজ স্থানটিকে। যদি আপনার ভ্রমণ হয় কয়েক ঘণ্টার, আর যদি নিজস্ব পরিবহন থাকে, তবে তো কথাই নেই।
দুপুরের পর গাড়ি হাঁকিয়ে চলে যান সোজা টঙ্গী স্টেশন রোডের ওভারব্রিজের কাছে। গাজীপুর যাওয়ার রাস্তা থেকে হাতের ডানে গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যান সোজা। কিছুটা পথ বন্ধুর। দুই-তিন কিলোমিটার পথ পেরোলেই বদলে যাবে চোখের সামনের সব দৃশ্যপট। চারদিকে শুধুই সবুজের ছড়াছড়ি। শরতের আকাশ থেকে হাল্কা অথবা ভারী বর্ষণ হয়তো আপনার আগমনকে স্বাগত জানাবে। এমনই এক আবহাওয়ায় আপনি ছুটে চলবেন আর উপভোগ করবেন মাজু খা বাজার এবং তার আশপাশের গ্রামগুলোর দৃশ্য।
এবার এখানকার বর্ণনাটা একটু দিয়ে নিই।
রাস্তার দুই ধারে হাওর আর বিল ভর্তি কচুরিপানায়। ছোট ছোট ডিঙি নিয়ে এরই মধ্যে কেউ কেউ মাছ শিকার করছে। সঙ্গে বড়শি থাকলে আপনিও যোগ দিতে পারেন। ক্লান্তি দূর করার জন্য ছোট ছোট চায়ের দোকান থেকে চা খেতে পারেন। গরুর দুধের তৈরি অসাধারণ চা।
মাজু খা বাজার। এখানে খাবারের দোকানগুলোয় দুপুরের পর থেকে ভাজা হয় পেঁয়াজু, ডালপুরি। নাকে এসে ঠেকে ভাজা-পোড়ার অদ্ভুত এক গন্ধ।
মাজু খা বাজার পেরুলেই আবার সবুজের হাতছানি। তিন কিলোমিটার রাস্তা পেরোলেই মীরের বাজার। আর একটু সামনে এগোলে দেখা যাবে পুবাইল রেলস্টেশন। যদি কেউ যাত্রাবাড়ী বা সায়েদাবাদের যানজট পাশ কাটিয়ে দ্রুত সিলেট, ভৈরব, ঘোড়াশাল যেতে চান, তাহলে এখান দিয়ে সহজেই যেতে পারবেন।
আর যদি পূবাইলের রাস্তায় পা না বাড়াতে চান, তবে বাঁ দিক দিয়ে জয়দেবপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার যে রাস্তাটি আঁকাবাঁকা হয়ে এগিয়েছে, সেই রাস্তা দিয়েও সোজা চলে যেতে পারেন।
এ স্থানের নাম ভাদুন গ্রাম। শুধু গ্রাম বললে ভুল বলা হবে। যেন পুরো গ্রামটিকে কোনো মালি সাজিয়ে রেখেছে বাগানের মতো। নানা রকম বনজ ফুল, লতাপাতা, তালগাছ, নারকেলগাছ—বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যাবে না। এমন সৌন্দর্যের চারপাশেই গড়ে উঠেছে অনেকগুলো অবকাশকেন্দ্র। কেউ চাইলে খোঁজ নিয়ে দরদাম ঠিক করে সেসব অবকাশকেন্দ্রে ঢুঁ দিতে পারেন ইচ্ছা করলেই। কোনোটিতে ৫০০ কিংবা কোনোটিতে হাজার টাকা দিলেই মিলবে সুস্বাদু সব খাবার। আর যদি রাতে থাকতে চান, তবে টাকার পরিমাণটা বাড়বে আরও কিছুটা।
এমনই একটি অবকাশকেন্দ্রের
ভেতরে ঢুকে দেখা যাবে একদিকে বনজঙ্গল, অন্যদিকে মানুষের জন্য আবাসস্থল গড়ে তোলা হয়েছে। আর একটু গেলেই দেখা যায় আধুনিক সব কটেজ। তার চেয়েও চমক অপেক্ষা করে বিলের কাছাকাছি গেলে। বিলের ধারে তৈরি করা হয়েছে পাটকাঠি আর বাঁশের তৈরি অসাধারণ সব ছাউনি। এখানে বসেই দেখা যায় বক কীভাবে বিলে উড়ে এসে বসে আর মাছ শিকার করে। এখানে পূর্ণিমা এলেই বসে গানের আসর। পর্যটকেরা যখন মধ্যাহ্নভোজ করেন, তখন একতারা, ঢোল, করতাল আর বেহালার বাজনা যেন মনে দোলা দিয়ে যায়। এসব ছাউনির নিচে থাকে পানি। রাতের বেলায় মুক্ত হাওয়ার পরশ নিতে নিতে একসময় কাঁপুনিও চলে আসে।
এখানকার কর্মীরা জানান, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কেউ এসে থাকতে চাইলে জনপ্রতি এক হাজার টাকা খরচ হবে। আর পুরো ২৪ ঘণ্টা থাকতে চাইলে জনপ্রতি খরচ হবে দুই হাজার টাকা। তবে সবার জন্যই উন্মুক্ত নয় স্থানটি। যারা পরিচিত, দুই-চারটি পরিবার একান্তই সময় কাটাতে চান, তাঁরা যোগাযোগ করে এই অবকাশকেন্দ্রে যেতে পারেন।
যাঁরা পুবাইল অঞ্চলে না গিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডে যেতে চান, সেখানেও পাবেন সুন্দর সুন্দর বেশ কিছু অবকাশ কেন্দ্র। যেমন গাজীপুর চৌরাস্তা ছেড়ে ময়মনসিংহ রোডে রওনা হলে তিন কিলোমিটারের মধ্যেই হাতের ডানে পড়বে বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বাঁয়ে পর্যটন নগরের সাইনবোর্ড। এই সাইনবোর্ডের পাশেই রয়েছে মেঠোপথ। শালবনের মধ্য দিয়ে সাপের মতো আঁকাবাঁকা এই পথ ধরে এগোতে থাকলেই কিছু দূর পর চোখে পড়বে বাগানবাড়ি। বাগানবাড়িতে ফুলের বাগান থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। শত শত গোলাপের গাছ আপনাকে স্বাগত জানাবে। ফুলের গন্ধ এসে নাকে ঠেকবে। কত রকমের গোলাপ যে ফুটে আছে এখানে।
এই বাগানবাড়িতেই আছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ ঘর। এখানে যে কেউ ইচ্ছা করলে এসে অখণ্ড অবসরের সময়গুলো কাটাতে পারেন। খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত রয়েছে এখানে। তবে রাতের বেলায় বাগানের বাইরে না বেরোনোই ভালো। কারণ চারদিকে বেশ জঙ্গল। এখানে থাকতে হলে দুই হাজার টাকার মধ্যেই পাওয়া যাবে কক্ষ। আর খাওয়া-দাওয়ার রয়েছে সুব্যবস্থা। বাড়তি পয়সা দিলেই খাবার মিলে এখানে।
শালনা নামের এই স্থান থেকে পাঁচ কিলোমিটার এগোলে মহাসড়কের পাশেই পড়বে নতুন অবকাশকেন্দ্র হ্যাপি ডে ইন। কোরিয়া ও বাংলাদেশের যৌথ ব্যবস্থাপনায় এই অবকাশকেন্দ্রে রয়েছে থাকার সুযোগ-সুবিধা এবং পার্টি বা কোনো ধরনের অনুষ্ঠান করারও সুব্যবস্থা।
এখানে এক রাতের জন্য কক্ষ ভাড়া দুই হাজার টাকা। রয়েছে সুইমিংপুল এবং সবুজ ধানক্ষেতের মনোরম দৃশ্য। এখানে বিকেল হলেই শুনতে পাওয়া যায় পাখপাখালির কিচিরমিচির। সন্ধ্যার আগেই চারপাশের পরিবেশ হয়ে আসে একদম শান্ত। রাতের বেলায় মনে হবে এ যেন এক ঘুমের রাজ্য। চারপাশে গাছগাছালি শুধু জেগে থাকে। আর নিরাপত্তা প্রহরীদের হঠাত্ হঠাত্ বেজে ওঠা বাঁশির শব্দ শুনে মনে হবে একজন কেউ জেগে আছে এখনো।

কীভাবে যাবেন
দুভাবেই যেতে পারবেন। গাজীপুর জেলা শহরের রাস্তা ধরে যাওয়া যায়, তেমনি আবার টঙ্গীর স্টেশন ব্রিজ পার হয়েও যেতে পারবেন। যাঁদের নিজস্ব গাড়ি নেই, তাঁরা টঙ্গীর স্টেশন রোড থেকে বাসে অথবা টেম্পোতে করে মীরের বাজার পর্যন্ত গিয়ে পড়ে রিকশাযোগে ভাদুন গ্রামের দিকে যেতে পারবেন।
গাজীপুর জেলা সদর হয়ে যেতে চাইলে, এখানে বেবিট্যাক্সি অথবা রিকশা অথবা ভ্যানে করে যেতে পারবেন।
তবে যাঁরা গাজীপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চলের অবকাশকেন্দ্রগুলোতে যেতে চান, তাঁরা এয়ারপোর্ট রোড ছেড়ে টঙ্গী হয়ে সোজা গাজীপুর চৌরাস্তা দিয়ে ময়মনসিংহ রোডে গেলেই ওখানে পৌঁছে যাবেন।

সতর্কতা
রাতের বেলা চলাফেরা করার সময় অবশ্যই টর্চলাইটের আলো ফেলে পথ চলবেন। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে রাতের বেলা বনজঙ্গল দিয়ে চলাফেরা না করা ভালো। একা একা চলাফেরা না করাটাও উত্তম।

কামরুজ্জামান
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, অক্টোবর ২০, ২০০৯

Sending
User Review
0 (0 votes)

Add Comment