পঞ্জিকা মতে বর্ষা মৌসুম শেষ। হলে কি হবে, মধ্য শরতেও বৃষ্টি পড়া বন্ধ হয়নি। এমন দিনে দেশের দক্ষিণাঞ্চল ঘুরে দেখার সাধ হল। যেতে হবে নদীতে ভেসে ভেসে। সেই নদীতে, চাইলে সাগরেও মিশে যাওয়া যাবে।

চর কচ্ছপিয়া হয়ে চর কুকরি-মুকরি, ঢাল চর ও চর পাতিলা ঘুরে বেড়াবো। সে জন্য ঢাকা থেকে যাচ্ছি ভোলার চর ফ্যাশন। কথা হয়েছে বন্ধু হাশেম মহাজনের সঙ্গে। তারপরই এক বৃহস্পতিবার রাতে যাত্রা শুরু করি।

লঞ্চে সদরঘাট থেকে যাবে বেতুয়া। এটা চর ফ্যাশনের অন্যতম নদী বন্দর। বেতুয়া থেকে চর ফ্যাশন শহরে কিছু সময় থেকে আমরা শশিভূশণ হয়ে চলে যাব চর কচ্ছপিয়া। তারপর ট্রলার বা স্পিডবোটে চর পাতিলা।

ঢাকা থেকে যে নদী দিয়ে শুরু করি সেই বুড়িগঙ্গা নদীর অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো। নদীর পানির ঘনত্ব কমেছে। এখন বুড়িগঙ্গাতেও মাছ ধরা পড়ে। বিলুপ্ত প্রায় শুশুক ঘুড়ে বেড়াতে দেখা যায়, আগের মতোই। তবে বুড়িগঙ্গার কোনো তেজ নেই। এসব ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আমাদের যাত্রা শুরু হয়। আমরা বলতে, আমি আর ওয়াজেদ মহান।

ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করেছিলাম দুজন। চর কচ্ছপিয়ায় এসে সে সংখ্যা দাঁড়ালো পাঁচে। হাশেম ভাই, আলাল ভাই আর সহযোগী জাকির তালুকদার। ঘাটে স্পিডবোট আমাদের জন্য তৈরি ছিল। তবে হাতের কাছে ইলিশের নাও পেয়ে লোভটা সেদিকেই গেল।

কচ্ছপিয়ার খাল দিয়ে আমাদের নিয়ে তরতর করে সে নাও এগিয়ে চলল চর পাতিলার দিকে। আমাদের নৌকা তেঁতুলিয়া নদীতে পড়তেই নদীর বিশালতা বোঝা গেল। তারপর বুড়া গৌরাঙ্গ হয়ে যখন বিশাল মেঘনায় পড়লাম মহানের চোখ দেখি চড়কগাছ। শুধু মহান কেনো যে কেউ নদীর এমন বিশাল রূপ দেখে বলবে একি সাগর না নদী। ‘নদীর কুল নাই/ কিনার নাই’- বুঝি একেই বলে। আর সেকি ঢেউ।

নদীতে ঢেউ খেলে যাচ্ছে, নৌকা দোল খাচ্ছে, সঙ্গে ঢেউয়ের ঝাপটা এসে লাগছে আমাদের নৌকায়। পানি আঁছড়ে পড়ছে নৌকার ভেতর।

মেঘনায় চলতে চলতে কত যে মাছ ধরার ট্রলার দেখলাম তার ইয়ত্তা নেই। মাঝ নদীতে ছোট্ট এক শিশুকে একটি কোষা নৌকায় বৈঠা হাতে কসরত করতে দেখলাম, একেই বলে নদীর জীবন। যেখানে আমাদের বুকে কাঁপন ধরায় সেখানে এরা নির্ভার।

বিশাল নদীর বিশাল রূপ। নদীর বর্তমান রূপ দেখে বোঝার উপায় নেই বর্ষা চলে গেছে। আমরা যখন চর পাতিলার অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছি তখন দূর থেকে দেখি গ্রামগুলোর কিছু কিছু বাড়ি ডুবে ডুবে দাঁড়িয়ে। আমার কাছে দৃশ্যটা অসাধারণ সুন্দর মনে হলেও এখানকার বাসিন্দাদের জন্য অবর্ণনীয় কষ্ট।

এরমধ্যে চর কুকরি-মুকরির ম্যানগ্রোভ বন পেরিয়ে চলে এসেছি চর পাতিলার বাঁকে, মানে আমাদের গন্তব্যের খুব কাছে। এখানে একটা কুকুর দেখি নদীর সাঁতরে পার হচ্ছে। চারিপাশের অথৈ পানির মধ্যে ছোট্ট দ্বীপ চরের মাঠে বিশ-পঁচিশটা গরু চড়তে দেখি। তারপর মেঘনার যে বাঁক পেরিয়ে আমরা ছোট্ট দ্বীপ চরে আমাদের মাছ ধরার নৌকা বা ইলিশের নাও নোঙর করি, সে জায়গাটির নামই চর পাতিলা।

পুরো চর জেঁকে ধরেছে অসংখ্য মাছ ধরার ট্রলার। আমরা যখন চর পাতিলার মাটি স্পর্শ করি তখন জুম্মার আজান দিচ্ছে। পাতিলার চরে পা দিয়েই বুঝতে পারি চরটা আসলেই মৎসজীবিদের আস্তানা। মাছের লোভে অনেক পাখিরও এখানে আনাগোনা।

চর পাতিলায় পা দিয়ে আমরা বিমোহিত বলা চলে। কাছে গিয়ে তো অবাক যেমন শুনেছি ঠিক তেমনি। চর পাতিলাকে মৎসজীবিদের আস্তানা বলা হলেও, সে আসলে ইলিশ মাছের আস্তানা। কিছুক্ষণ পরপর দুরের নদী বা সমুদ্র থেকে ট্রলার ভর্তি ইলিশ আসছে আর বিভিন্ন মাছের গদিঘর বা আড়তে সে মাছ চালান হচ্ছে।

এসব মাছের আড়তে ডাক ওঠেনা। আড়তদার জেলেদের দাদন দিয়ে থাকেন। যে আড়তের মালিকের কাছ থেকে জেলেরা টাকা নিয়ে থাকে, মাছ সেই আড়ত মালিক পেয়ে থাকে।

হাশেম মহাজন এ বিষয়ে বললেন, “পানিতে আমার লক্ষ লক্ষ টাকা। পানির মতোই ফুলে উঠতে পারে, আবার ডুবে যাওয়াটা কোনো ব্যাপার না।”

আমরা তার কথা শুনি আর ইলিশ মাছ দেখি, মাছের নৌকা এলেই ছুটে যাই। মাঝে মধ্যে এক থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশ দেখলে সেই মাছ স্পর্শ করে দেখি। সে স্পর্শ সত্যি অদ্ভূত শিহরন জাগানিয়া। সেই শিহরণ বুকে নিয়ে দুপুরের খাবারে মনোনিবেশ করি। ইলিশভুনা, ইলিশ-ভাজা, ইলিশ-ভর্তা, পুঁইশাক দিয়ে ইলিশ-মাথা, আহা পুরো বিষয়টাই ইলিশময়।

খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম। তারপর আবার ক্যামেরা হাতে বের হই। ঘুরে দেখি চর পাতিলার গ্রাম বাজার স্কুল মসজিদ। বঙ্গপোসাগরের কোল ঘেসা মেঘনা পারের দ্বীপ চর কুকরিমুকরি। চর কুকরিমুকরির একটি ইউনিয়ন চর পাতিলা।

প্রাকৃতিক দূর্যোগ এখানে স্বাভাবিক ঘটনা। এই নিয়ে চরের কারও কোনো টেনশন নেই। তবে চরের বাসিন্দা ইদ্রিশ আলীর আক্ষেপ চরটা মনে হয় থাকছে না। ভাঙনের কবলে পড়ে একবারে শেষ অবস্থা চরের। আমি ইদ্রিশ আলীর এই আক্ষেপ নিয়ে চর পাতিলার একপ্রান্ত থেকে ওপর প্রান্তে ছুটে বেড়াই আর ক্যামেরায় বিরামহীন ক্লিক করে চলি।

এভাবে বেশি সময় চলে না। অল্প কিছুক্ষণে জাকির তালুকদারের খোঁজাখুঁজিতে আমি আবার মেঘনা পারে পৌঁছে যাই। তখনও ইলিশ আসছে। আবার অনেক জেলেকে দেখলাম অলস সময় কাটাতে। রাতে মাছ ধরতে বের হবেন। অনেকেই বসেছে জাল নিয়ে। ফুটাফাটা জাল মেরামত করে নিচ্ছেন। অনেক জেলে রাতে তাদের নৌকা মাছ ধরা দেখতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখে।

আমরা ইলিশ নৌকায় চেপে মাছ ধরা দেখতে গিয়েছিলাম কিনা সে গল্প আজ থাক, শুধু এটুকু বলি, এভাবে ইলিশ দেখে দেখে ইলিশ ইলিশ একটা দিন কাটিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয় ‘দেখ আমরা ইলিশ রাজ্যে এসেছি, মাছ রাজার বাড়ি!’

প্রয়োজনীয় তথ্য 

ঢাকা থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় এবং সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বেতুয়া ও ঘোসের হাটের লঞ্চ ছেড়ে যায়। সুবিধা অনুযায়ী যে কোনো লঞ্চে চড়ে বসুন।

বৃহস্পতিবার রাত হলে অগ্রীম টিকেট কেটে নিন। লঞ্চ থেকে বেতুয়া বা ঘোসের হাট নেমে সরাসরি চলে যান চর কচ্ছপিয়া। এখানে লাইনের ট্রলার বা রিজার্ভ ট্রলার নিয়ে চলে যান চর পাতিলা।

চর পাতিলায় থাকার ব্যবস্থা নিজেদের করে নিতে হবে। দলবেঁধে গেলে তাবু কিংবা স্থানীয় কারও বাড়ি, মাছের গদিঘর ভরষা। সারাদিন ইলিশ মাছ দেখুন চাইলে রাতেও। পারলে ইলিশ নৌকায় চড়ে জেলেদের মাছ ধরা দেখে আসতে পারেন।

এতদূর ভ্রমণ করে যাবেন উদ্দেশ্য কেবল চর পাতিলা তো নয়, আশপাশে অনেক এমন চর আছে দেখে আসবেন। যেমন চর কুকরি-মুকরি, ঢাল চর, সোনার চর, তারুয়ার দ্বীপ ইত্যাদি।

এখানে খাবারের সমস্যা নেই। ছোটখাটো হোটেল আছে আগে বলে রাখলেই রান্নার বা খাবারের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

সচেতনতা

নদীপথে যাতায়াতে একটু বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সম্ভব হলে সঙ্গে লাইফ জ্যাকেট রাখবেন। শুকনা খাবার এবং প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ সঙ্গে রাখবেন। একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন আপনার বা আপনার ভ্রমণ সঙ্গীদের মাধ্যমে পরিবেশ হুমকিতে পড়ে এমন কোনো কিছু অবশ্যই করা চলবে না। পলিথিন বা প্লাস্টিকের বোতলসহ পরিবেশ বিপন্ন হয় তেমন কিছু ফেলে আসবেন না।

সোর্স : ফারুখ আহমেদ  বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম