সাঁড়ে পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চতুর্থ রাজবংশীয় ফারাও খুফু-র বিশাল পিরামিড। নীল নদের পিশ্চম তীরে। মিশরের রাজধানী কায়রো শহরের দক্ষিণ প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে মৃতের নগরী- ‘দ্য নেক্রোপলিস আব মেম্‌ফিস’। সেই মৃত্যুনগরীর সেরা আকর্ষণ গিজার পিরামিড-ত্রয়ী। রয়েছে রানিদের আলাদা পিরামিড। আইসিসের মিন্দর আর অপার রহস্যে মোড়া স্ফিংস। জগিদ্বখ্যাত কায়রো মিউজিয়াম স্বমহিমায় বিরাজমান এই মহানগরেই।

গিজার পিরামিড ত্রয়ী

ধূ ধূ মরুভূমি। মাথার ওপরে ঝকঝকে নীল আকাশ আর নীচে রোদ মাখা চিকচিকে বালুকণা। আপাদমস্তক ঢাকা আরোহী-সহ উট। আর বিশাল ক্যানভাসের ছবিটা সম্পূর্ণ করতে দূরে বিরাজ করছে তিনকোনা পিরামিডের আবছা আভাস।
সেই ছোটবেলার স্ক্র্যাপবুকে এ ছবির মূল্য ছিল ধরাছোয়ার বাইরে।

এই ছবির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের বইয়ের পাতা ও কিশোর মনের কল্পনা। ফারাওদের মমি, তার সঙ্গে তাদের অসীম ঐশ্বর্য ও অদ্ভুত জীবনধারা এবং অবশ্যই পিরামিডের সেই গহ্বর। সব মিলিয়ে কৌতূহল ও বিস্ময়ে ঠাসাঠাসি মিশর ও তার নীল নদ।

জুন মাসের মাঝামাঝি কায়রো বিমানবন্দরে নেমে তাই স্বপ্ন ও বাস্তবের মাঝামাঝি একটা জায়গায় মিনিট খানেকের জন্য আটকে গিয়েছিলাম। অসংখ্য পর্যটকের ভিড় যে শহরে, তার বিমানবন্দর কিন্তু একেবারেই আটপৌরে। বিদেশি বিমানবন্দর দেখলে যেমন আমার মতো মধ্যবিত্ত বাঙালি হা হয়ে যাই, কায়রো তেমনটা নয়। চেকিং-এর সময় যেমন কোন কাউন্টারে কী দেখবে তা নিয়েই ছোট্ট একটা গোলমাল তৈরি হয়ে গেল। সব দেখে কিছুটা স্বিস্তই পেলাম। যাক! আমাদের মতোই এ দেশের আদবকায়দা।

বাইরে বেরিয়ে বাতানুকূল বাসে ওঠার পর অবশ্য ছবিটা বদলে গেল। ট্যুর-গাইড যিনি, তিনি চূড়ান্ত পেশাদার। আজিজ নামে সেই বছর তিরিশের যুবক হাসিমুখে সবার সব রকম প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করছিলেন। বাসে একটা গান বাজছিল। শব্দ বুঝতে পারছিলাম না আমরা কেউই। কিন্তু সুরটা যেন চেনা চেনা। আবার প্রশ্ন আজিজকে।

রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নীল নদ

মুচকি হেসে পাল্টা প্রশ্ন– কোনও হিন্দি ফিল্মের গান মনে পড়ছে কি? আরে, তাই তো! সুফি সঙ্গীতে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে হাল আমলের ফিল্মি গানের সুর। বিষয়টা পরিষ্কার করে দিল আজিজ। হিন্দি ফিল্মের ভক্তের সংখ্যা নেহাত কম নয় এই অচিন দেশে।

শহরে ঢুকে পড়ে বাস চলল হোটেলের দিকে। কিছু দূর গিয়েই যে রাস্তা ধরল, তা নীল নদের ধার ঘেষে। গাইড বলা মাত্র জানলার উপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমরা, অর্থাৎ বিভিন্ন দেশের নানান প্রান্ত থেকে বিভিন্ন ভাষায় কর্মরত সাংবাদিকরা। বিস্ফারিত চোখে যা দেখলাম তার সঙ্গে সেই স্ক্র্যাপবুকের ছবির নদীর নীল রঙের কোনও মিল নেই। বহু দিনের অযেত্ন আমাদের গঙ্গার যেমন ধূসর রং, ঠিক তেমনই নীল নদের ছবিটা। তবুও মনে পড়ে গেল সেই ছোটেবলার ইতিহাস বইয়ের পাতা। নস্টালজিয়ার পথ ধরে চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই ‘হায়রোগ্লিফিকস’-এর আকিবুকি।

ঝকঝকে রাস্তায় চলতে চলতে ইতিহাসের পাতা থেকে একেবারে আধুনিক কায়রোতে পা রাখলাম। চোখ জুড়িয়ে যাওয়া হোটেল। তার কারণ অসাধারণ ব্যাকড্রপ! আমরা যে হোটেলে উঠলাম, তার সামনে চওড়া একটা রাস্তা। আর তার পরেই নীল নদ। সেই সুবাদেই হোটেলের নাম ‘নাইল হিলটন’। ঘরের জানলা থেকে নীল নদ! আরও বড় অবাক হওয়ার পালা অবশ্য অপেক্ষায় ছিল। হোটেলের রুফ-টপ রেেস্তারা থেকে গিজার তিন পিরামিডের হালকা আউট লাইন। পড়ন্ত সূর্যের লাল আলোয় মায়াবী ইতিহাস। নিজেকে চিমটি কেটে পরখ— স্বপ্ন নয় তো!

টানা ঘন্টা আটেকের সফর শেষে হোটেলের বিছানা খুবই টানছিল। মনে হচ্ছিল একটু জিরিয়ে নিতে পারলে হত। কিন্তু লোভ সংবরণ করলাম আমরা সকলেই। কারণ আরও বড় প্রলোভন ছিল যে। হোটেলে আসার পথে, আজিজ বাসেই জানিয়েছিলেন, বিকেলটা নষ্ট করা যাবে না। নীল নদের ধারে ঘোরার পরেই ‘নাইল ক্রুজ’। অর্থাৎ নীল নদে নৌকাবিহার। সে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। পুরোপুরি পাচতারা বিনোদন। ওয়াইন সুগন্ধী হুকা এবং জিভে জল আনা খাবার। তার সঙ্গে বেলি ডান্সারদের নাচ। বা স্থানীয় ফোক ডান্স। খাদ্যতালিকায় কিন্টনেন্টাল ছাড়াও ছিল লেবানিজ ও মিশরীয় খাবার। নিজেকে ভোজনরসিক বললে বোধহয় কম বলা হবে, আমি বাচিই খাওয়ার জন্য। তাই সবার চোখ যখন বেলি ডান্সারদের দিকে, আমি তখন েপ্লটের ওপর ল্যাম্ব আর বিভিন্ন রকমের পাউরুটি আহরণে ব্যস্ত। সব মিলিয়ে ঘন্টা তিনেকের ‘নাইল ক্রুজ’ বিনোদনের শেষ কথা।

নদী ভ্রমণ সেরে রাতে বিছানায় গা ডুবিয়ে দিয়ে কায়রোর প্রথম দিন শেষ। পরের দিন সকালে পিরামিড দর্শন। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সেই স্বপ্নই দেখলাম।

পর দিন সকালে বাসে চেপে গিজার উেদ্দশে রওনা দিলাম। কায়রো শহরের খুব কাছেই। সেই গিজা যেখানে রয়েছে খুয়ারু, খুফু ও মেনকুরার পিরামিড। আর তা পাহারা দিতে বিখ্যাত স্ফিংস। পৌছতে কতক্ষণ লেগেছিল ঠিক মনে নেই। তখন কেবল প্রতিক্ষা একটারই— পিরামিড। এবং কিছুক্ষণ পরেই চোখের সামনে ভেসে উঠল ইতিহাসের সেই টুকরো। ইতিহাস! বিস্ফারিত চোখে প্রথম দেখা। পিরামিডের গায়ে হাত বুলিয়ে দেখে নিলাম সত্যি না স্বপ্ন। দ্রষ্টব্য নয়। ইতিহাসই। যা রয়েছে আমাদের ছোটবেলার পড়ার বই ও কল্পলোকের অনেকটা জায়গা জুড়ে।

কায়রোর দক্ষিণ প্রান্ত থেকে শুরু করে নীল নদের পিশ্চম তীর ধরে বিশাল এলাকা জুড়ে মিশরের বিশ্ববিখ্যাত পিরামিড প্রান্তর। প্রায় চার হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীন এই সমাধি প্রান্তরের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ গিজার তিনটি পিরামিড। সবচেয়ে বড়টি চতুর্থ রাজবংশীয় ফারাও খুয়ারুর। অন্য দু’টি যথাক্রমে খুফু ও মেনকুরার পিরামিড বলে পরিচিত।

মিশরের পিরামিড স্থাপত্য প্রধানত এক ছকে বাধা। পিরামিডের অন্দরমহল মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত। সর্বনিম্ন স্তরে অর্থাৎ পিরামিডের ভিতের ওপর পাথর কেটে তৈরি ফারাওয়ের সমাধি। এই সমাধির ওপরই গড়ে উঠত পিরামিড। রাজসমাধি ছাড়াও থাকত ফারাওয়ের নিজস্ব কক্ষ, রানির খাস মহল এবং এক বিশাল হলঘর যা ‘গ্রাণ্ড গ্যালারি’ নামে পরিচিত। ফারাও খুয়ারুর মমির আধার বা সারকোফ্যাগাস একটি আস্ত লাল আসওয়ান গ্রানাইট পাথর খণ্ড খোদাই করে তৈরি। আধারটি নিশ্চয়ই পিরামিডের ভেতরে বসে তৈরি হয়েছিল কারণ সমাধিকক্ষের দরজার তুলনায় তা অনেক বড় মাপের। সমাধিকক্ষের পাশে ছোট ছোট ঘরে খাবার, পানীয় ও দৈনিন্দন জীবন যাপনের নানা সামগ্রী রাখা থাকত। মৃত্যুর পরে পরলোকবাসে ফারাও ও তার িপ্রয়জনদের যেন কোনও অসুবিধে না হয়— সে ব্যাপারে যত্ন নেওয়া হত। রাজা ও রানির ঘরে ছোট ঘুলঘুলি রাখা থাকত যেগুলো পিরামিডের বহিরাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সেই পথেই বিভিন্ন সময়ে দৈনিক প্রয়োজনীয় জিনিস ফারাওয়ের উদ্দেশে উৎসর্গ করা হত।

গিজার পিরামিড তিনটির প্রত্যেকটির পূর্বদিকে ছোট উৎসর্গ কক্ষ লক্ষ করা যায়। সংখ্যায় এমন উৎসর্গ-মিন্দর অজস্র। পিরামিডগুলি সমতলভূমি থেকে প্রায় ১০০ ফুট উচু মালভূমির ওপর তৈরি হয়েছিল। এগুলিতে প্রবেশ করার জন্য সমতল থেকে একটি ঢালুপথ পিরামিডের প্রধান প্রবেশদ্বার অবধি তৈরি হত। এই ঢালুপথের গোড়ায় থাকত একটি তোরণ বা মিন্দর। গিজায় এমনই এক প্রবেশ মিন্দর হল স্ফিংসের মিন্দর। এই মিন্দরটি মূলত দ্বিতীয় অর্থাৎ খুফুর পিরামিডের প্রবেশ পথের গোড়ায় তৈরি হয়েছিল।

গিজার পিরামিড চত্বরের প্রধান আকর্ষণ বিশাল পিরামিডটি ফারাও খুয়ারুর। এছাড়া খুফুর পিরামিড, খুয়ারুর তিন রানির তিনটি অপেক্ষাকৃত ছোট আকৃতির পিরামিড। বড় পিরামিডের পাশে অগুনতি ‘মাসতাবা’ বা অন্যান্য রাজপুরুষদের সমাধি। আইসিস্‌-এর ছোট মিন্দর এবং মেনকুরার পিরামিড এই কমেপ্লেক্সর আওতায় পড়ে। খুয়ারুর পিরামিড পৃথিবীর আদি সপ্তম আশ্চর্যের একটি। ইতিহাস বলে, সুদীর্ঘ ২০ বছর ধরে এই পিরামিড তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন রেওয়াজের পরিপন্থী হয়ে ফারাও খুয়ারু নিজের সমাধি সৌধ নির্মাণে কোনও ক্রীতদাসকে ব্যবহার করেননি। প্রতি বছর নীল নদের মহাপ্লাবনে সমতলভূমি ভেসে যেত বলে তিন মাস মিশরে চাষ-আবাদ শিকেয় উঠত। সেই সময়ে মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ত এবং তাদের পিরামিড তৈরির কাজে নিয়োগ করা হত। পারিশ্রমিকের চল ছিল না বটে, কিন্তু দয়ালু ফারাওয়ের অনুগ্রহে কর্মীরা সুখাদ্য ও পোশাক পেত প্রয়োজন মতো।

গিজার তিনটি পিরামিড শুধুমাত্র বিশালেত্বর কারণেই বিস্ময় দাবি করতে পারে। দেখতে যে দারুণ সুন্দর, তা নয়। অন্তত বাইরে কোনও কারুকার্য নেই যা নজর টানবে। কিন্তু এর টান সেই কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস। যা এখনও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক টেনে চলেছে। বিশাল-বিশাল পাথর একের পর এক বসিয়ে তৈরি পিরামিডের আকৃতি একেবারে নিখুত। ভিতরে অবশ্য যাওয়া নিষেধ। স্থানীয়দের মতে, এত বছরের লুণ্ঠন কিছু অবশিষ্ট রাখেনি। একটি পিরামিডে অবশ্য কয়েক ধাপ নীচে নামতে দেওয়া হয়। অনেক কসরত করে মাথা নিচু করে, প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে নেমে অবশ্য দেখার কিছু মিলবে না। তবে ছবি তোলার সুযোগ রয়েছে।

বন্ধুদের কাছে ফিরে এসে গল্পের একটা আইটেম হতে পারে অবশ্য। পিরামিডের আশেপাশে অসংখ্য উট ঘুরে বেড়াচ্ছে। উটের গলার দড়ি হাতে নিয়ে স্থানীয়রা কিছু টাকার বিনিময়ে পর্যটকদের একপাক ঘুরিয়ে আনবেন। টাকা মানে ইজিপ্সিয়ান পাউণ্ড।

দিনের আলোয় স্ফিংস

লাইট অ্যাণ্ড সাউণ্ড-এ স্ফিংস

এই চত্বরের কাছেই স্ফিংস। বর্তমানে পৃথিবীর একমেবাদ্বিতীয়ম স্ফিংস মূর্তিটির ঠিকানা মিশরের গিজা মালভূমিতে। নীল নদের পশ্চিম তীরে। গিজার পিরামিড ত্রয়ীর রক্ষক হিসেবেই তার পরিচয়। এ যুগেও সিংহ ও মানুষের এই অদ্ভুত মিশেল সমীহ জাগায়। স্ফিংসের চারপাশে কড়া পাহারায় রয়েছেন রক্ষীরা। লাইন করে ভিতরে যেতে হয়। সেখানে বিশাল-বিশাল থাম। মনে হল জিওমেট্রিক্যাল কোনও হিসেব মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এখানে আবার পয়সা ফেলে মনষ্কামনা পূরণের ব্যাপারও রয়েছে।

দিনের আলোয় এ-সব দেখে অপেক্ষা করতে লাগলাম সেন্ধর আলো আধারিতে ‘লাইট অ্যাণ্ড সাউণ্ড’-এর জাদুর জন্য। অন্ধকার নামার পরে চিল্লশ মিনিটের আলো ও শব্দের খেলা। স্ফিংসকে ব্যাকগ্রাউণ্ডে রেখে শুরু হয় এই মায়ার খেলা। গল্পটা এই তিন পিরামিডের ফারাওদের নিয়ে। মনে হল সোজা পৌছে গেছি সেই মিশরে যেখানে ফারাওরা ছিলেন ‘রা’ অর্থাৎ সূর্যের প্রতিনিধি। গোটা চত্বরটাই কেমন অন্য রকম রূপ নিয়েছিল। জানি না তা কল্পনার ডানা মেলার কারণে— নাকি স্থান মাহাত্ম্যের কারণে।

কয়েক ধাপ নীচে নামার পথ

থামের সারি

গিজায় পিরামিড দেখতে যাওয়ার পথেই প্যাপিরাস ইনিস্টটিউট। আশেপাশে রয়েছে আরও অনেক প্যাপিরাসের দোকান। প্যাপিরাস— যার থেকে পেপার শব্দের উৎপত্তি। এখানে গেলে দেখা যাবে বিশেষ একটি ঘাস থেকে কেমন ভাবে তৈরি হয় এই কাগজ। তার উপরে বিভিন্ন রং দিয়ে তৈরি হয় মিশরের ফারাওদের ছবি। বা সে-সময়ের যুদ্ধ যাত্রার ছবি। উপহার হিসাবে খুবই লোভনীয় আইটেম। বা নিজের ঘরের দেওয়ালে নেফারটিটি সাজিয়ে রাখাটাও। দাম মোটামুটি পাচ থেকে দশ ডলারের মধ্যে।

প্যাপিরাস ইনিস্টটিউট ছাড়াও আছে একটি মেমেেন্টা শপ। পর্যটকদের প্রায় সকলেই এখান থেকে কিছু না কিছু কিনে নিয়ে যান ‘মেমেন্টো’ হিসেবে। আমার নজর কাড়ল শোকেসে রাখা গয়নায়। মিশরীয় হরফ বা হায়রোগ্লিফিকসের আদলে গলার হারের সঙ্গে লকেট। কিনেই ফেললাম। কলকাতায় এসে পরতে পারব কি না জানি না, তবে মেমেন্টো করে তো রাখাই যায়।

পরের দিন আমাদের বেড়ানোর তালিকায় ছিল পিরামিডের মতোই বড় আইটেম। কায়রো মিউজিয়াম।

কায়রো শহরের মধ্যে রয়েছে কায়রো মিউজিয়াম। এই জাদুঘর দেখতে অন্তত দু’দিন সময় লাগে। কিন্তু আমাদের হাতে ছিল মাত্র দু’ঘন্টা। তাই ঝটিতি দেখে নেওয়া। আমার মতে জাদুঘরের মূল আকর্ষণ হল মমি। মমি-ঘরটা বেশ ঠাণ্ডা। বিশেষ ভাবে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখতে হয় এখানে। সার-সার শোয়ানো মমি। ফারাও এবং তাদের রানিদের। এদের নখ, চুল দেখে শরীরে একটা অদ্ভুত শিরশিরানি হচ্ছিল। কেমন একটা গা ছমছম করা পরিবেশ। মমি ঘরের শীতলতা যেন তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমাদের দলের দু’-চার জন তো বেশ তাড়াহুড়ো করেই বেরিয়ে এলেন।

টুতানখামেন

নেফারটিটি

জাদুঘরে রয়েছে সবচেয়ে কম বয়সের ফারাও টুতানখামেনের মমির কাসকেট ও গয়না। পুরো সোনার তৈরি সেই কাসকেট-এর কারুকার্য দেখলে মোহিত হতে হবে। আর যে ঘরে সমস্ত গয়না রাখা আছে, তা চোখ ঝলসে দেওয়ার মতো। অসম্ভব সুন্দর হাতের কাজ সেই সব গয়নায়। এ ছাড়াও জাদুঘরে রয়েছে সে সময়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। রয়েছে বিশাল মাপের নৌকো। স্বর্গে যাওয়ার যান। ফারাওরা তাই বিশ্বাস করতেন। সেই সূত্রেই পিরামিডে মমির সঙ্গে অন্যান্য নিত্যব্যবহার্য জিনিসের সঙ্গে দিয়ে দেওয়া হত এই নৌকাও।

কায়রোয় রয়েছে মহম্মদ আলির মসজিদ বা ‘দি সিটাডেল’। এই মসজিদের চারপাশে রয়েছে অ্যালাব্যাস্টার ঢাকা দেওয়াল এবং গম্বুজ। গম্বুজের রুপোলি মাথা রোদের আলোয় আরও রাজসিক দেখতে লাগে। মসজিদের ভিতরে রয়েছে বিশাল উচু সিলিং। দেওয়ালে সোনা-রুপোর কাজ। এখানে মহিলাদের প্রার্থনা করার পৃথক জায়গা রয়েছে। সেটা অনেকটা ব্যালকনির মতো ব্যবস্থা। আর এর চত্বর জুড়ে রয়েছে হরেক মেমেন্টোর পসরা।

দি সিটাডেল

সব মিলিয়ে কায়রোর দ্রষ্টব্য দেখা শেষ। এ বার ঘরে ফেরার পালা। সেই একই রাস্তা ধরে নীল নদের ছবি পিছনে ফেলে আবার উড়ান ধরতে যাওয়ার তাড়া।

গার্গী গুহঠাকুরতা
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ জুন ২০০৮