শান্তিনিকেতনে একদিন

shantiniketan1

সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে শোনো শোনো পিতা…। ট্রেন থেকে নেমেই তাকে পাবেন। কেননা বোলপুর স্টেশনে দিনরাত অবিরত বেজে চলেছে রবীন্দ্রসংগীত। মৃত্যুর ১৩ দিন আগে এই স্টেশন থেকেই কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কবিগুরুকে চিকিৎসার জন্য। রবীন্দ্রনাথ যেতে চাননি। কেননা শান্তিনিকেতনে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন ‘প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ ও আত্মার শান্তি’; ভয় ছিল যদি আর ফিরে না আসতে পারেন। তাঁর আশঙ্কাই সত্য হয়েছিল।

কুয়াশা কেটে গিয়ে সকালবেলার রোদ ফুটছে বোলপুরে। ছোট্ট স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসছে নানা বয়সী লোকজন, দেশি-বিদেশি। আমরা রিকশা নিলাম। শীতের রোদ্দুরমাখা সকাল কেটে কেটে এগিয়ে চলল রিকশা।

রবীন্দ্রনাথ এই শান্তিনিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা গুরুদেব, এ পরিচয়টা এক সময় ছাপিয়ে যায় তাঁর অন্য পরিচয়গুলোকে। ১৯২১ সালে সুইডিশ একাডেমিতে দেওয়া নোবেল বক্তৃতারও একটা বড় অংশজুড়ে ছিল বোলপুরের শিক্ষাকেন্দ্রের জন্য তাঁর চিন্তাভাবনা। শিক্ষা ও চৈতন্যের বিকাশের এক নতুন ধারা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন কবিগুরু এই শিক্ষাকেন্দ্রের মধ্য দিয়ে।

শান্তিনিকেতনে পৌষ মেলা শেষ হয়েছে কদিন আগে। পূর্বপল্লির মাঠে বসে এই মেলা। এখানে এসে থামতে হয় সব যান্ত্রিক যানবাহনকেও। ট্যুরিস্ট বাস ও গাড়ি থেকে নেমে পর্যটকেরা হয় হেঁটে নয়তো রিকশা নিয়ে আশ্রমের ভেতর ঢুকে পড়ে। বিশ্বভারতী বুধবার ছুটি থাকে। ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠার দিনটি পবিত্র বুধবার হিসেবে পালিত হতো মহর্ষির সময় থেকেই। সেদিন বুধবার বলে আশ্রম নীরব। ছাত্রছাত্রীদের কোলাহল নেই। অবারিত মাঠে গাছের নিচে উন্মুক্ত শ্রেণীগুলোও শূন্য। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘এই বিদ্যালয়ে বেঞ্চি টেবিল চৌকির প্রয়োজন নাই। আমাদের বিদ্যালয়ে অনাবশ্যককে খর্ব করিবার একটা আদর্শ সর্বপ্রকারে স্পষ্ট করিয়া তুলিতে হইবে।’

শীত যাই যাই করছে। শান্তিনিকেতনের খোয়াইয়ের পথে লাল ধুলো উড়ছে; জীর্ণ পাতা ঝরে পড়ে পায়ের কাছে। এখানে কান পাতলেই প্রকৃতির গান শুনতে পাওয়া যায়। এই পাতা ঝরার আওয়াজ, বকুলতলায় ঝরে পড়া শিশির, ছুটে চলা কাঠবিড়ালি, গাছের কোটরে পাখির বাচ্চা, হাতিপুকুরের শান্ত জল, শালবীথির শান্ত নির্জন পথ—সবাই মিলে এই সংগীত রচনা করে চলেছে। ‘এই তো ভালো লেগেছিল আলোর নাচন পাতায় পাতায়, শালের বনে খ্যাপা হাওয়া, এই তো আমার মনকে মাতায়।’ এ নিশ্চিত এখানকারই গান।

১৮৬৩ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রায়পুরের জমিদারের কাছ থেকে ২০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করার পর নির্জনে ঈশ্বরের উপাসনা করবেন বলে বোলপুরে যে দোতলা বাড়িটি তৈরি করেছিলেন, তা বর্তমানে ঐতিহ্য ভবন (হেরিটেজ বিল্ডিং) হিসেবে ঘোষিত। এই বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ প্রথম এসেছিলেন ১২ বছর বয়সে, উপনয়নের পর। ছোটবেলায় পড়া লীলা মজুমদারের লেখায় সেই ছোট্ট রবির প্রথম শান্তিনিকেতন আস্বাদের বর্ণনা এখনো মনে পড়ে। ‘রবি তৎক্ষণাৎ সত্যর সেই মায়াপুরীর রাস্তা খুঁজে বের করবার জন্য লেগে গেল। দূর অবধি এবড়ো থেবড়ো খোয়াই চোখে পড়ল, তারপর একটি ঘন নীল রেখার মতো দিগন্ত। মাথার উপর উন্মুক্ত নীল আকাশ, ঝলমলে রোদ, ঝিরঝিরে হাওয়া আর পাখির গান।…সেই প্রথম দিন থেকেই রবি জায়গাটাকে ভালোবেসেছিল।’ মহর্ষির বাড়ির দক্ষিণে অনেক আমগাছ, তার তলায় একটি বড় বেদী। এটিই সেই বিখ্যাত আম্রকুঞ্জ। এই বেদীতে বিশ্বভারতীর সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর এই আম্রকুঞ্জে কবিগুরুকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ১৯৪০ সালে গান্ধীজি যখন শান্তিনিকেতনে আসেন, তখনো এখানেই কবি তাঁর জন্য সংবর্ধনার আয়োজন করেন।

কলাভবনের সামনেই রয়েছে রামকিঙ্করের বিখ্যাত দুটি ভাস্কর্য—দুই সাঁওতাল রমণী সন্তানসহ কারখানায় কাজ করতে যাচ্ছেন আর এক সাঁওতাল শ্রমিক পরিবারের দেশান্তর যাত্রা। কলাভবন স্থাপিত হয় ১৯১৯ সালে। তার পরপরই কলাভবনের দায়িত্ব নেন নন্দলাল বসু। তরুণ চিত্রকর নন্দলাল বসুর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ দেখতে পেয়েছিলেন অমিত সম্ভাবনা। পরবর্তী সময়ে বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় ও রামকিঙ্কর বেজের যোগদানের মাধ্যমে কলাভবন আরও পূর্ণতা পায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ একই সঙ্গে বিশ্বজনীনতায়ও বিশ্বাসী ছিলেন। তাই ১৯২১ সালে আমন্ত্রণ জানান ভিয়েনার শিল্প-ইতিহাস বিশেষজ্ঞ স্টেলা ক্রামরিশকে, আসেন ফরাসি চিত্রশিল্পী অঁদ্রে কার্পেলেস ইউরোপীয় ভিত্তিচিত্র ও তেলরং শেখাতে, হাঙ্গেরীয় শিল্পী লিজা ফন পট ও মার্গারেট মিলওর্ড শিক্ষা দেন পশ্চিমা পদ্ধতিতে মূর্তি রচনা, তিব্বতীয় তনখাচিত্র শেখানোর জন্য তিব্বত থেকে আসেন শিল্পী, চীনা শিল্পরীতি শেখাতে আসেন ইয়াউ উয়ান শান, বীরভূম থেকে ঢালাই কাজের কারিগর, ওডিশার পাথর কাটার কারিগর এবং জয়পুরের ভিত্তিচিত্র কারিগরেরাও সমাদর পান এখানে। ওই সময় প্রাচ্যের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব ছিল অভাবিত ঘটনা। বিশ্বভারতীকে পূর্ব-পশ্চিমের সত্যিকার মিলনস্থল ও জ্ঞানের কেন্দ্র রূপে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি। ‘ত্যাগ না করিয়া, বিনাশ না করিয়া একটি ব্যবস্থার মধ্যে সকলকেই স্থান দেওয়া’—রবীন্দ্রনাথের এই বিশ্বায়নের ভাবনা এখনো প্রাসঙ্গিক।
রবীন্দ্র জাদুঘরে ঢোকার আগে ক্যামেরা-ব্যাগ ইত্যাদি জমা দিতে হয়। নোবেল পদক চুরি যাওয়ার পর নিরাপত্তায় খুব কড়াকড়ি। তবে দর্শনার্থীদের ভিড়ে জাদুঘর-দর্শন প্রায় অসম্ভব মনে হলো। আর কেন যেন এসব সাজিয়ে রাখা বইখাতা, চিঠিপত্র, পাণ্ডুলিপি, ব্যবহূত তৈজসপত্র আর দেয়ালে টাঙানো ছবির চেয়ে রবীন্দ্রনাথকে বেশি খুঁজে পাওয়া যায় এসবের বাইরে যে লাল নুড়ি বিছানো পথ চলে গেছে উদয়ন, কোনার্ক, শ্যামলী, পুনশ্চ আর উদীচী ছাড়িয়ে আরও দূরে, গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথে। জ্যামিতিক গোলাপ বাগান, কবির নিজহাতে লাগানো নিমগাছের ছায়া আর মাটির দেয়াল মাটির ছাদের বাড়ি শ্যামলী যেখানে এসে গান্ধীজি বরাবর উঠতেন, তার মাঝে পাতা ঝরার গান আর মন কেমন করা বাউলি বাতাস—এখানেই রবীন্দ্রনাথকে অনেক বেশি করে পাওয়া যায়।
রোদ্দুর হেলে পড়েছে পশ্চিমে। রিকশা ফিরে চলল স্টেশনের দিকে। ট্রেনের জন্য অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বোলপুরের শরীরজুড়ে আশ্চর্য এক সন্ধ্যা নামে। এই শীত শীত আবেশমাখা সাঁঝবেলায় হঠাৎ টের পাই, যাকে খুঁজতে এসেছিলাম এখানে, তার পরশ সব পথে সবদিকেই ছড়িয়ে আছে।
পথে চলে যেতে যেতে কোথা কোনখানে, তোমার পরশ আসে কখন কে জানে কি অচেনা কুসুমের গন্ধে কি গোপন আনন্দে কোন পথিকের কোন গানে তোমার পরশ আসে কখন কে জানে।

তানজিনা হোসেন
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মার্চ ২৯, ২০১১

ট্যাগস:

ডিসেম্বর ২৯, ২০১১ | পশ্চিম বঙ্গ | ৩,০৫৬ বার পঠিত | ৩টি মন্তব্য

  • চাচা মিআ

    আমার খুব ইচছা ১ বার শান্তি নিকেতন যাবার।
    এই লেখা টা ামার ইচছা টা আরো উতসাহিত করল,,, আর আমার পথ বেপারে ও ধারনা সহজ হল।
    সুখি !

  • azad

    It is an execellent travel story! Thank you so much for sharing your thought with us. Sorry, I am writing in English, because I do not have Avro!

  • Radhenath das

    RADHENATH DAS